সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি: দেশের যুবসমাজকে ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায় বড়সড় রূপান্তরের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় সরকার। শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বা আইটিআই (ITI) এবং ন্যাশনাল স্কিল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলির (NSTI) আধুনিকীকরণ ও ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সেলেন্স (NCoE) স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা গড়ে তোলাই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে ‘প্রধানমন্ত্রী স্কিলিং অ্যান্ড এমপ্লয়াবিলিটি থ্রু আপগ্রেডেড আইটিআইস’ বা পিএম-সেতু (PM-SETU) প্রকল্পের আওতায় একটি শিল্প-নেতৃত্বাধীন মডেল গ্রহণ করা হয়েছে।
লোকসভায় একটি লিখিত উত্তরে এই তথ্য জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোগ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী (স্বতন্ত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত) শ্রী জয়ন্ত চৌধুরী (Jayant Chaudhary)। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইটিআই ও এনএসটিআই আপগ্রেডেশনের এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে শিল্পের সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে উঠবে। এর জন্য বিশেষ উদ্দেশ্য বাহন বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (SPV) গঠন করা হবে, যেখানে শিল্প অংশীদাররা নেতৃত্ব দেবে এবং রাজ্য সরকার সহযোগী ভূমিকা নেবে। পিএম-সেতু প্রকল্পের অধীনে কোনও শিল্প সংস্থাকে অংশীদার হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য ‘স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান’ বা এসআইপি (Strategic Investment Plan) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই এসআইপি জমা দিতে হবে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) -এর উত্তরে। মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল শিল্প সংস্থাগুলির আগ্রহ আহ্বান করতে এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট বা আরএফপি প্রকাশ করেছে। তবে আইটিআই আপগ্রেডেশন বা নতুন এনসিওই স্থাপনের জন্য অর্থ ছাড় সম্পূর্ণভাবে এসআইপি অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল।
এই প্রকল্পে কোন কোন আইটিআই অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সরকারের হাতে। শিল্প সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ করে এই নির্বাচন করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় শিল্প সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের দক্ষতার চাহিদার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য বজায় থাকে। পিএম-সেতুর অধীনে হাব-অ্যান্ড-স্পোক (Hub-and-Spoke) মডেলে আইটিআই ক্লাস্টার তৈরি করা হবে। শিল্প অংশীদারদের প্রতিক্রিয়া ও আগ্রহের ভিত্তিতেই কোন ক্লাস্টার আর্থিক সহায়তা পাবে, তা চূড়ান্ত করা হবে। এরই মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) পিএম-সেতু প্রকল্পের পাইলট পর্যায়ে পাঁচটি সরকারি আইটিআই চিহ্নিত করেছে। এই পাঁচটি আইটিআই নিয়ে একটি ক্লাস্টার গঠন করা হচ্ছে, যেখানে একটি হাব আইটিআই এবং চারটি স্পোক আইটিআই থাকবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, হাব আইটিআইটি গড়ে উঠবে বিশাখাপত্তনম (Visakhapatnam)-এ। স্পোক আইটিআইগুলির মধ্যে একটি করে থাকবে বিশাখাপত্তনম ও বিজয়নগরম (Vizianagaram) জেলায় এবং দুটি থাকবে আল্লুরি সীতারাম রাজু (Alluri Sitarama Raju) জেলায়। এই ক্লাস্টারের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় দক্ষতা উন্নয়ন মন্ত্রকের মতে, এই প্রকল্পের মূল সুফল পাওয়া যাবে তিনটি স্তম্ভের উপর ভর করে, রাজ্য নেতৃত্বাধীন নির্বাচন প্রক্রিয়া, শিল্পের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং একটি কাঠামোবদ্ধ বাস্তবায়ন ব্যবস্থা। এই লক্ষ্যেই ইতিমধ্যেই বিভিন্ন শিল্প সংগঠন ও শিল্প প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির আধিকারিকদের জন্য হাতে-কলমে সহায়তা বা হ্যান্ডহোল্ডিং ওয়ার্কশপও আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বহু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আরএফপি ও এসআইপি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। সেই চাহিদার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার একটি আদর্শ আরএফপি নথি, বিশদ টেমপ্লেট এবং আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মশালার আয়োজন করেছে। এর ফলে রাজ্যগুলি সময়মতো ও মানসম্মত প্রস্তাব জমা দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। জয়ন্ত চৌধুরীর কথায়, ‘পিএম-সেতু প্রকল্প কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শিল্প ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাস্তব ও কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলা হবে।’ তাঁর মতে, এই মডেল বাস্তবায়িত হলে প্রশিক্ষণার্থীরা সরাসরি শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বহুগুণে বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে এখনও বিপুল সংখ্যক আইটিআই থাকলেও বহু প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি, আপডেটেড পাঠক্রম ও শিল্প-সংযোগের ঘাটতি রয়েছে। পিএম-সেতু প্রকল্প সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। শিল্প নেতৃত্বাধীন এসপিভি মডেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মান যেমন বাড়বে, তেমনই প্রশিক্ষণ শেষের পর কর্মসংস্থানের পথও অনেকটাই মসৃণ হবে।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সেলেন্স বা এনসিওই স্থাপন। এই কেন্দ্রগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের দক্ষতা পরিকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে। অটোমেশন, রোবোটিক্স, গ্রিন স্কিল, ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো ভবিষ্যৎমুখী ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুবসমাজকে গ্লোবাল জব মার্কেটের উপযোগী করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য, পিএম-সেতু প্রকল্পের মাধ্যমে আইটিআই আপগ্রেডেশন ও এনসিওই স্থাপন ভারতের দক্ষতা উন্নয়ন নীতিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়, শিল্পের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কাঠামোবদ্ধ বাস্তবায়নের ফলে আগামী দিনে এই প্রকল্প দেশের কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে- এমনটাই আশা নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Modi Europe Trade Speech, Budget Session Narendra Modi | বাজেট অধিবেশনে ইউরোপ-মুখী মোদী! আমেরিকা প্রসঙ্গ এড়িয়ে ১৩ মিনিটের বার্তায় কি ট্রাম্পদের উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক ইঙ্গিত?




