সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লী : মধ্য প্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। গাজা থেকে ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক একাধিক ইস্যুতে টানাপোড়েনের আবহেই ইজরায়েল সফরে গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর এটি তাঁর প্রথম ইজরায়েল যাত্রা। এই সফর ঘিরে কূটনৈতিক মহলে যেমন আগ্রহ তুঙ্গে, তেমনই নতুন এক প্রস্তাবিত জোটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) ঘোষণা করেছেন ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্স’ গঠনের পরিকল্পনা, যেখানে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভাবা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সক্রিয় চরমপন্থী শক্তির মোকাবিলায় একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই এই জোটের লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ‘এই হেক্সাগন হবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নতুন ভিত্তি।’ প্রস্তাবিত এই কাঠামোয় ভারত ছাড়াও গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আরব বিশ্বের কিছু দেশ, আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি রাষ্ট্রকেও যুক্ত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
এই ঘোষণার সময়টিই তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ইরান-আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে গাজ়া পরিস্থিতি এসব মিলিয়ে মধ্য প্রাচ্য জটিল পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। ইজরায়েল-হামাস সংঘাত এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ‘হেক্সাগন’ ধারণা সামনে আসায় কূটনৈতিক বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ইজরায়েলের তরফে জানানো হয়েছে, শিয়া প্রভাববলয়ের অন্তর্গত শক্তি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের কথাই ভাবা হচ্ছে। ভারতের পক্ষে এই সফর বহুমাত্রিক। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, কৃষি প্রযুক্তি, সাইবার সুরক্ষা এবং জল ব্যবস্থাপনা এই চারটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা আগেই প্রতিষ্ঠিত। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ। ড্রোন প্রযুক্তি, মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নজরদারি সরঞ্জামে সহযোগিতা রয়েছে। সফরকালে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, ‘দুই দেশের সম্পর্ক এখন কৌশলগত অংশীদারিত্বের স্তরে পৌঁছেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হবে।’ গাজ়া শান্তি প্রক্রিয়া, ইজরায়েল-হামাস সংঘাত, ইরান প্রসঙ্গ সবই আলোচ্যসূচিতে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্স’ প্রস্তাব ঘিরে বিতর্কের আরেকটি দিক হল সমান্তরাল জোট রাজনীতি। পাকিস্তান ও সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ন্যাটোর আদলে একটি ইসলামিক সামরিক জোট গঠনের পথে এগিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, যেখানে তুরস্কের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও উত্থাপিত হয়েছে। ফলে মধ্য প্রাচ্যে বহুস্তরীয় জোট-রাজনীতির সূচনা হতে পারে বলেই অনেকে মনে করছেন। ভারতের অবস্থান বরাবরই কৌশলগত ভারসাম্যের। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলির সঙ্গে জ্বালানি ও প্রবাসী ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা, এই দুই সমীকরণ সামলে চলতে হয় নয়াদিল্লিকে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘হেক্সাগন’-এ ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকা কতটা সক্রিয় হবে, তা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে।
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও নেতানিয়াহুর বৈঠকে কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। ইজরায়েলের ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি ভারতে ইতিমধ্যেই সফল হয়েছে। জলস্বল্পতার মোকাবিলায় যৌথ গবেষণাও হতে পারে। প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ ক্ষেত্রেও দুই দেশের পারস্পরিক আগ্রহ রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে অনেকে বলছেন, ‘হেক্সাগন’ যদি বাস্তব রূপ পায়, তবে তা মধ্য প্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভারতের সিদ্ধান্ত হবে নিজস্ব কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায়। নয়াদিল্লি অতীতে বহুক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে, বহুপাক্ষিক মঞ্চে অংশগ্রহণ করলেও স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম।
তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। ২০১৭ সালে মোদীর প্রথম ইজরায়েল সফর ছিল ঐতিহাসিক, কারণ স্বাধীনতার পর প্রথমবার কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সে দেশে গিয়েছিলেন। এবার সেই সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্য নিয়েই সফর। উল্লেখ্য, মধ্য প্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্স’ কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা সময় বলবে। তবে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মোদীর ইজরায়েল সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে এই সফর নজরে রাখছে কূটনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on India US Trade Deal | ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’, দেশের প্রত্যেকেরই লাভ হবে: এনডিএ বৈঠকে ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




