তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ : সন্তানদের সঙ্গে পিতামাতার সম্পর্ক সবসময়েই আবেগপূর্ণ। তবে সেই আবেগ কখনও কখনও অসাম্যের দিকে ঢলে পড়ে। কোনও একটি সন্তানকে অতিরিক্ত ভালবাসা বা বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে অপর সন্তানটির মনে যে গভীর প্রভাব পড়ে, তা শুধু মানসিক নয়, দীর্ঘমেয়াদী জীবনেও ছাপ ফেলে। সম্পর্কবিদদের মতে, বাবা-মায়ের অজান্তেই যে পক্ষপাত চলে, তা বহু সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
সম্প্রতি ‘সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন’ (Psychological Bulletin)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাবা-মায়েরা অনেক সময় এমন সন্তানদের বেশি পছন্দ করেন যারা দায়িত্বশীল, ভদ্র ও মিশুক। এমনকী প্রথম সন্তান বা বাবা-মায়ের পছন্দের মতো স্বভাববিশিষ্ট সন্তানদের প্রতিও বেশি স্নেহ থাকে। এই প্রসঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষক রিচা কাপুর (Richa Kapoor) বলছেন, “অনেক পিতামাতা বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা কারও প্রতি বেশি পক্ষপাত করছেন। কিন্তু বাকি সন্তান সেটি তীব্রভাবে অনুভব করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস, সম্পর্কের মানসিক কাঠামো, এমনকি ভবিষ্যতের আত্মসম্মান পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
মনে রাখতে হবে, পক্ষপাতদুষ্ট ভালবাসা সবসময় জেনে হয় না। মা-বাবা অনেক সময়েই বোঝেন না যে, তাঁদের ব্যবহারে বৈষম্যের ছাপ থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যদি কোনও সন্তান অসুস্থ হয়, শারীরিক বা মানসিকভাবে দুর্বল হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি একটু বেশি যত্নশীল হন তাঁরা। কিন্তু সেই অতিরিক্ত মনোযোগ বাকি সন্তানের কাছে অপছন্দ ও অবহেলার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
একজনকে বেশি ভালবাসার কিছু সাধারণ কারণ
১. যে সন্তানটি বেশি দায়িত্বশীল ও শান্ত স্বভাবের।
২. প্রথম সন্তান হওয়ার কারণে তার সঙ্গে বাবা-মায়ের বেশি স্মৃতি ও বন্ধন।
৩. পছন্দসই লিঙ্গ (Gender) অনেক পরিবারেই এখনও ছেলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়
৪. বাবা-মায়ের স্বভাবের সঙ্গে মিল থাকলে স্বাভাবিকভাবে বেশি সংযোগ তৈরি হয়
৫. অসুস্থ বা দুর্বল সন্তানের প্রতি বাড়তি সহানুভূতি
এই পক্ষপাতের ফলাফল কতটা গভীর হতে পারে?
যে সন্তানটি উপেক্ষিত বোধ করে, তার আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগে। তারা নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে তার পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতার উপরেও।
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অভিষেক রায় (Abhishek Roy) বলছেন, “পছন্দ-অপছন্দের এই খেলা শুরু হয় ছোটবেলায়, কিন্তু এর রেশ থেকে যায় যৌবনেও। যে সন্তানটি বারবার অবহেলা পায়, সে বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।” এমনকী অনেক সময় সেই সন্তান নেতিবাচক মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টায় নিজেই ভুল পদক্ষেপ নেয় : ইচ্ছে করে ভুল করা, রাগ দেখানো, এমনকী ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়াও এই মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
কীভাবে বাবা-মা এই ফেভারিটিজম এড়াতে পারেন?
আচরণে সতর্কতা: নিজে কতটা পক্ষপাত করছেন, তার সচেতন মূল্যায়ন করুন।
সমান সময় ভাগ করুন: প্রত্যেক সন্তানের সঙ্গে আলাদা সময় কাটান।
তুলনা নয়, উৎসাহ: একে অপরের সঙ্গে তুলনা না করে প্রত্যেকের বিশেষত্বকে প্রশংসা করুন।
খোলামেলা যোগাযোগ: সন্তানের অনুভবের প্রতি গুরুত্ব দিন, তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করুন।
বিশেষজ্ঞ অনন্যা দত্ত (Ananya Dutta) জানাচ্ছেন, “প্রত্যেক সন্তান চায় সে যেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি যদি একটিকে সবসময় প্রশ্রয় দেন, অন্যটি চুপচাপ সরে যাবে। আপনি হয়তো বুঝতেই পারবেন না, কখন সে একা হয়ে গেল।”
একটি পরিবারে পক্ষপাত যেন ছায়ার মতো ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য প্রয়োজন সুস্থ, সংবেদনশীল পারিবারিক সংস্কৃতি। একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সমান শ্রদ্ধা এবং ভালবাসাই পারে পারিবারিক বন্ধনকে অটুট রাখতে। যদি কোনও একটি সন্তানকে অতিরিক্ত যত্নের প্রয়োজন হয়, সেটি পক্ষপাত নয়, বরং কর্তব্য। তবে বাকি সন্তানটিকে বোঝাতে হবে, কেন সেই অতিরিক্ত যত্ন দেওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে সে নিজেও এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতে পারে। এই পারস্পরিক বোঝাপড়াই গড়ে তোলে সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী


