সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তেজনা ছড়াল ধর্মতলায়। শুক্রবার বিকেলে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর ধর্নামঞ্চের সামনে আচমকাই বিক্ষোভ দেখালেন কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষক। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান, তাঁদের দাবি একটাই, দ্রুত বেতন বৃদ্ধি ও চাকরির স্থায়ীকরণ। হঠাৎ এই বিক্ষোভে কিছুক্ষণের জন্য পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই পুলিশ এসে বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
শুক্রবার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে এলাকায় ধর্নায় বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। ধর্নামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী, সাংসদ এবং বিধায়করা। রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল। এই অবস্থান কর্মসূচী চলাকালীনই হঠাৎ করে ধর্নামঞ্চের সামনে এসে জড়ো হন কয়েকজন পার্শ্বশিক্ষক। তাঁদের হাতে ছিল নানা দাবি লেখা প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল, বেতন বৃদ্ধি, স্থায়ীকরণ এবং অন্যান্য সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার দাবি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা স্লোগান দিতে শুরু করেন। ঘটনায় মঞ্চের সামনে মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি দেখে মঞ্চ থেকেই প্রতিক্রিয়া জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘শান্ত হয়ে থাকতে পারলে থাকবেন। এখানে রাজনীতি করবেন না। বিজেপির কথায় এ সব করবেন না।’ একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এই জায়গা খোলামেলা বলে ভাববেন না, যা খুশি করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী কিংবা অমিত শাহের সামনে গিয়ে এসব দেখান।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের আটক করে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায়। যদিও পুরো ঘটনাই কয়েক মিনিটের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আসে, তবু রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধি এবং চাকরির স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলনে সরব পার্শ্বশিক্ষকেরা। আদালতের নির্দেশে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা Bikash Bhavan -এর সামনে অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের স্কুলগুলিতে কাজ করলেও এখনও তাঁদের স্থায়ী পদমর্যাদা দেওয়া হয়নি এবং বেতনের অঙ্কও অত্যন্ত কম। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার কালীঘাট অভিযানের ডাক দিয়েছিল পার্শ্বশিক্ষকদের সংগঠন শিক্ষা অধিকার মঞ্চ। ওই কর্মসূচী শিয়ালদহ থেকে মিছিল শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, মিছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ধরে কালীঘাট পর্যন্ত যাবে। কিন্তু পুলিশ কলেজ স্ট্রিট এলাকায় পৌঁছনোর আগেই মিছিল আটকে দেয়। ফলে সেখানে শুরু হয় পথ অবরোধ ও অবস্থান বিক্ষোভ। দীর্ঘ সময় ধরে সেই অবরোধ চলায় শহরের যান চলাচলেও প্রভাব পড়ে। পার্শ্বশিক্ষকদের দাবি, তাঁদের আন্দোলন নতুন নয়। ২০০৯ সালে আন্দোলনের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই আন্দোলনের মঞ্চে এসে স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরে ২০১১ সালে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার বৈঠকে ধাপে ধাপে স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁদের দাবি। কিন্তু এত বছর কেটে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের বক্তব্য, গত ১৫ বছরে তাঁদের অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। এখনও অস্থায়ী অবস্থায় কাজ করতে হচ্ছে এবং আর্থিক নিরাপত্তাও নেই। তাঁদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে এবং ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে গত বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও সামনে আসে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাজ্যের শিক্ষা দফতর থেকে পার্শ্বশিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল নবান্নতে। সেখানে প্রাথমিক স্তরের পার্শ্বশিক্ষকদের মাসিক বেতন ২৮ হাজার টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরের পার্শ্বশিক্ষকদের ৩২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু অভিযোগ, সেই প্রস্তাব এখনও কার্যকর হয়নি এবং প্রশাসনিক স্তরেই আটকে রয়েছে। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে পার্শ্বশিক্ষকদের মধ্যে।
শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, আরও বেশ কিছু দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু করা, চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্য এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য চাকরির সুযোগ দেওয়ার মতো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে হঠাৎ বিক্ষোভের ঘটনা রাজ্যের চলমান শিক্ষক আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে, তবু পার্শ্বশিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ যে এখনও প্রশমিত হয়নি, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট। এদিকে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। শাসকদল এবং বিরোধীদের মধ্যে পাল্টা মন্তব্যও সামনে আসছে। তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : TMC Rajya Sabha, Suvendu Adhikari Statement | রাজ্যসভা প্রার্থী বাছাই নিয়ে মমতাকে নিশানা শুভেন্দুর




