সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হায়দরাবাদ : প্রেমিককে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পরিবার সেই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। সেই অস্বীকৃতিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভয়ংকর প্রতিশোধে। বাবা-মাকে বিষ খাইয়ে খুনের অভিযোগ উঠল এক তরুণী নার্সের বিরুদ্ধে। তেলঙ্গানার (Telangana) ভিকারাবাদ (Vikarabad) জেলা থেকে উঠে আসা এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা রাজ্য জুড়ে। অভিযুক্ত নার্স সুরেখাকে (Surekha) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, প্রেমের বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় পরিকল্পিতভাবেই নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে তিনি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন।পুলিশ সূত্রে খবর যে, সুরেখা তেলঙ্গানার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। পেশায় নার্স হওয়ায় চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন ওষুধ এবং ইঞ্জেকশনের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ছিল। গত কয়েক বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি সেই সম্পর্কের কথা পরিবারকে জানান এবং স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি প্রেমিককেই বিয়ে করতে চান। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক নানা কারণে সুরেখার বাবা-মা এই বিয়েতে রাজি হননি। সেখান থেকেই শুরু হয় পারিবারিক অশান্তি।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে প্রায়ই বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়াতেন সুরেখা। তাঁদের কথায়, ‘মাঝেমধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হতেই পারে, সেটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে, ভাবতেই পারিনি।’ পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও উঠে এসেছে, পরিবারে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা উত্তেজনা চলছিল। প্রেমের বিয়েতে অনড় অবস্থান এবং পরিবারের বিরোধিতা, এই দুয়ের সংঘাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সুরেখা। পুলিশের দাবি, সেই হতাশা থেকেই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেন অভিযুক্ত নার্স। তদন্তে জানা গিয়েছে, তিনি যে হাসপাতালে কাজ করতেন, সেখান থেকেই কৌশলে কড়া মাত্রার ওষুধ বা বিষ সংগ্রহ করেন। ঘটনার দিন রাতে বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ার পর তাঁদের শরীরে সেই বিষ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা দু’জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে স্বাভাবিক মৃত্যুর সন্দেহ করা হলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বিষক্রিয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। তারপরই তদন্তের গতি বদলায়। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে সুরেখার কথাবার্তায় অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে কড়া জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভেঙে পড়েন বলে পুলিশের দাবি। তদন্তকারীদের একাংশের বক্তব্য, অভিযুক্ত নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বাবা-মায়ের বিরোধিতায় তিনি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ভিকারাবাদ জেলার একজন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক জানান, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা নিশ্চিত যে এটি পরিকল্পিত খুন। অভিযুক্তের পেশাগত জ্ঞান এবং ওষুধের সহজলভ্যতাই এই অপরাধ সংঘটিত করতে সহায়তা করেছে।’ পুলিশ জানিয়েছে, কী ধরনের বিষ বা ইঞ্জেকশন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ফরেন্সিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে। সেই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই চার্জশিট পেশ করা হবে।
এই ঘটনা সামনে আসতেই সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এক দিকে প্রেমের স্বাধীনতা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে, এমন নৃশংস অপরাধের কোনও যুক্তি থাকতে পারে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। মনোবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পরিবার ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার সংঘাত এবং সহায়তার অভাব অনেক সময় মানুষকে ভয়ংকর পথে ঠেলে দেয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, কোনও পরিস্থিতিতেই খুনের মতো অপরাধকে正当তা দেওয়া যায় না। পাশাপাশি, নার্সিং পেশার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। একই সঙ্গে তাঁরা দাবি করেছেন, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সত্য পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসে।
বর্তমানে সুরেখা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর প্রেমিকের ভূমিকা বা তিনি এই ঘটনার সঙ্গে কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তের ফোন কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই মামলায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও উঠে এল পরিবার, প্রেম এবং সামাজিক চাপের জটিল সম্পর্ক। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই, প্রেমের বিয়েতে বাধা মানেই কি বাবা-মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া? এই ভয়াবহ অপরাধ তারই নিষ্ঠুর উত্তর হয়ে রইল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Child Murder Due to Extra Marital Affair | যে চোখে ধরা পড়েছিল অপরাধ, সেই চোখ চিরতরে বন্ধ! শিশুহত্যায় দোষী সাব্যস্ত মা




