সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: উত্তরবঙ্গকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা গেল রাজ্যের নতুন বাজেটে। প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটেই উত্তরবঙ্গবাসীর জন্য একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করল শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) নেতৃত্বাধীন সরকার। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামো, শিল্প, পর্যটন প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta)। এই বাজেটের পর রাজনৈতিক মহলে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, উত্তরবঙ্গ কী তবে নতুন উন্নয়ন অধ্যায়ে পা রাখতে চলেছে? সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে এ বার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগের বরাদ্দ যেখানে ছিল ৯২০.১৩ কোটি টাকা, সেখানে নতুন বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৮২১.৫২ কোটি টাকায়। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আগেই বলেছিলেন, ‘উত্তরবঙ্গের কাছে আমরা ঋণী, এখন সেই ঋণ শোধের সময়।’ বাজেটের ঘোষণাগুলিতে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন মিলছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঘোষণা দুটি নতুন বিমানবন্দর। কেন্দ্রীয় ‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতায় মালদহ (Malda) এবং বালুরঘাট (Balurghat)-এ বিমানবন্দর তৈরি হবে। পাশাপাশি কোচবিহার (Cooch Behar) বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের কথাও জানানো হয়েছে। এতে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের অন্যান্য প্রান্তের যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু বিমান নয়, শহর পরিবহণেও নতুন ভাবনা। কলকাতার বাইরে মেট্রো পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার। প্রাথমিকভাবে শিলিগুড়ি (Siliguri) ও জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) এলাকায় মেট্রো পরিষেবার সম্ভাবনা নিয়ে ‘টেকনো-ইকনমিক সার্ভে’ শুরু হয়েছে। সফল হলে উত্তরবঙ্গের পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে আইআইটি (Indian Institute of Technology) এবং আইআইএম (Indian Institute of Management) গড়ে তোলার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কোচবিহারের তুফানগঞ্জ (Tufanganj)-এ একটি মহিলা কলেজ তৈরি হবে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে ও স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের বাইরে না গিয়েই পড়াশোনা করার সুযোগ তৈরি হবে। স্বাস্থ্য পরিষেবায়ও নজর কেড়েছে একাধিক পদক্ষেপ। উত্তরবঙ্গে একটি এমস (AIIMS) স্থাপনের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। দার্জিলিং (Darjeeling)-এ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ট্রমা সেন্টার তৈরি হবে। আলিপুরদুয়ার (Alipurduar), কালিম্পং (Kalimpong) এবং দক্ষিণ দিনাজপুর (South Dinajpur)-এ নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলের মানুষ উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পেতে পারেন।
ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়াম এবং একটি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। এই খাতে চলতি অর্থবর্ষে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুবসমাজকে ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত করতে বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও ভাবা হচ্ছে। পর্যটন শিল্পকে শক্তিশালী করার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। ডুয়ার্সকে (Dooars) কেন্দ্র করে অরণ্য, বন্যপ্রাণী এবং উপজাতীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরে পর্যটনের নতুন দিশা তৈরি করতে চায় প্রশাসন। ট্রেকিং, হাইকিং, র্যাফটিং, প্যারাগ্লাইডিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনকেও উৎসাহ দেওয়া হবে।
শিলিগুড়িকে উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়ক, রেল এবং বিমান যোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি এখানে একটি ‘কমন টি প্রসেসিং সেন্টার’ তৈরি হবে, যার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এতে চা শিল্পে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিলিগুড়ির আইটি পার্ক উন্নয়নে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তুলতে আরও ২০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। চা শিল্পে দীর্ঘদিনের সমস্যার দিকে নজর দিয়ে জমি ব্যবহারের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। টি-ট্যুরিজমের জন্য জমি ব্যবহারের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে চা বাগানের জমি রক্ষা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে চা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে ঝোরা সংরক্ষণে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে জলসম্পদের সুরক্ষা ও স্থানীয় জীবিকার উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন বাজেটে উত্তরবঙ্গের একাধিক অঞ্চলকে পুরসভায় উন্নীত করার কথাও বলা হয়েছে। উত্তর দিনাজপুর (North Dinajpur)-এর হেমতাবাদ (Hemtabad), করণদিঘি (Karandighi), মালদহের গাজোল (Gazole), চাঁচল (Chanchal), মানিকচক (Manikchak) এবং দার্জিলিঙের শিবমন্দির (Shibmandir) এলাকায় নতুন পুরসভা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নাগরিক পরিষেবা আরও উন্নত হবে। এই বাজেট নিয়ে দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা (Raju Bista) বলেছেন, ‘এই বাজেট উত্তরবঙ্গের যুবসমাজকে নতুন সুযোগ দেবে, চা শিল্পে গতি আনবে এবং পাহাড়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে।’ অন্যদিকে বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদার (Sukanta Majumdar) এই বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, ‘দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি পূরণের পথে এটি বড় পদক্ষেপ।’
অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মণ (Anandamoy Barman) বলেন, ‘নতুন পুরসভা গঠনের মাধ্যমে বহু মানুষ নাগরিক পরিষেবা পাবেন, যা এত দিন পেতে সমস্যার মুখে পড়তে হত।’ তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত উত্তরবঙ্গের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে এই বিস্তৃত পরিকল্পনা রাজ্যের উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখতে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। তবে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই পরিষ্কার, উত্তরবঙ্গকে সামনে রেখেই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ গড়ে তুলতে চাইছে রাজ্য সরকার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : North East India films MIFF 2026 | উত্তর-পূর্ব ভারতের বহুস্বর এক মঞ্চে, MIFF 2026-এ বিশেষ বিভাগে ঐতিহ্য, ইতিহাস ও প্রকৃতির অনন্য চিত্র তুলে ধরছে একগুচ্ছ ছবি




