Neelkanth bird release Vijayadashami | দশমীর দিন আর উড়ে না নীলকণ্ঠ, বিলুপ্ত এক প্রথার ইতিহাস ও বর্তমানের শিক্ষা

SHARE:

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উৎসবের আনন্দ, ভক্তির আবহ আর পাঁচ দিনের উন্মাদনার শেষে বিজয়া দশমীর বিষণ্ণতা যেন এক অবিচ্ছেদ্য অনুভূতি। কিন্তু এক সময় এই বিষাদের সঙ্গে মিশে থাকত এক বিশেষ আচার, নীলকণ্ঠ (Indian Roller) পাখি ওড়ানো। কলকাতার বনেদী বাড়ি থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার অনেক জায়গাতেই দশমীর দিন আকাশে ভেসে উঠত নীলকণ্ঠের রঙিন ডানা। এখন তা আর দেখা যায় না। প্রাচীন এই প্রথা আজ শুধুই স্মৃতির পাতায়। কেন এই প্রথার প্রচলন হয়েছিল আর কেনই বা সময়ের সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে গেল, তা নিয়েই আলোচনা।

বাঙালি সমাজে নীলকণ্ঠ পাখিকে শিবের প্রতিনিধি মনে করা হয়। দেবী দুর্গা যখন কৈলাসে স্বামী শিবের কাছে ফিরে যান, তখন দশমীর দিন এই পাখিকে উড়িয়ে দেওয়া হত দেবীর ফেরার বার্তা পাঠানোর জন্য। জনশ্রুতি ছিল, নীলকণ্ঠ সরাসরি কৈলাসে পৌঁছে শিবকে দেবীর আগমনের সংবাদ দেবে। এই রীতিটি দেবীকে বিদায় জানানোর এক প্রতীকী আচার হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয় কাহিনি ছাড়াও রামায়ণের উল্লেখ রয়েছে এই প্রথার পেছনে। বিশ্বাস করা হয়, রামচন্দ্র রাবণবধে যাওয়ার আগে নীলকণ্ঠ পাখিকে দেখেছিলেন। সেই দৃশ্যকে শুভ যাত্রার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়েছিল। তাই বিজয়া দশমীতে এই পাখি উড়িয়ে বিজয়ের বার্তা দেওয়া হত। উৎসবের আনন্দে মিশে যেত শুভকামনার বিশ্বাস।

Neelkanth bird (Indian Roller) release was once a major Vijayadashami ritual in Bengal. Learn why this tradition started, its cultural significance, and why it was stopped due to cruelty and wildlife laws. বিজয়া দশমীতে নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানো ছিল বাঙালির সংস্কৃতির অংশ। জানুন কেন এই প্রথার প্রচলন হয়েছিল এবং কী কারণে তা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
নীলকণ্ঠ পাখি। ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

কিন্তু, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকে এই প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। এর মূল কারণ ছিল পাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা। দশমীর আগে বহু শিকারি জঙ্গলে বা গ্রামাঞ্চলে নীলকণ্ঠ ধরে বাজারে বিক্রি করত। ক’য়েক দিন খাঁচায় বন্দি থাকার পর তারা দুর্বল হয়ে পড়ত। অনেক ক্ষেত্রে খাবার-জল কম দেওয়া হত, যাতে সহজে ধরা থাকে। ফলে উড়িয়ে দেওয়ার পর অনেক পাখিই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। এই নিষ্ঠুরতা নিয়ে সচেতন মহলে প্রবল বিরোধিতা শুরু হয়।পরবর্তীতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ (Wildlife Protection Act, 1972)-এর আওতায় নীলকণ্ঠকে সংরক্ষিত প্রজাতি ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে এই পাখি ধরা, বন্দী রাখা কিংবা কেনাবেচা সম্পূর্ণ বেআইনি হয়ে যায়। আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। সরকারের পদক্ষেপ, পরিবেশপ্রেমীদের আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা ধীরে ধীরে এই রীতির অবসান ঘটায়।

প্রাণী সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবেশগত দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অবাধ শিকার এবং ব্যবসার ফলে নীলকণ্ঠ পাখির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল। পরিবেশবিদরা বহুবার সতর্ক করেছিলেন যে, এভাবে চললে একদিন প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সৌভাগ্যবশত আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার ফলে এখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই পাখি ফের দেখা যায়। এর উজ্জ্বল নীল রঙের ডানা গ্রামীণ আকাশে আবারও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে। বর্তমান প্রজন্ম হয়ত আর প্রত্যক্ষভাবে দেখেনি বিজয়া দশমীতে নীলকণ্ঠ উড়ানোর দৃশ্য। কিন্তু এই ইতিহাস জানলে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, প্রকৃতি ও জীবজগতের সুরক্ষা আরও বড় দায়িত্ব। ঐতিহ্যের আড়ালে যে নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে ছিল, সময় তার অবসান ঘটিয়েছে। আর সেই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার ভারসাম্য বজায় রাখাই হল প্রকৃত উন্নতির পথ। নীলকণ্ঠ পাখি আজও বাংলার সংস্কৃতিতে সৌন্দর্য ও শুভ প্রতীকের স্থান ধরে রেখেছে। তবে সেই প্রতীকী জায়গা এখন আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে নয় ; তা প্রকৃতিকে রক্ষা করার মধ্যে। বিজয়া দশমীর দিনে নীলকণ্ঠ ওড়ানো আর না হলেও, দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগে কোনো খামতি নেই। কিন্তু সেই আবেগ এখন আরও মানবিক, আরও পরিবেশবান্ধব।

ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Bijaya Dashami 2025 Greetings, Durga Puja 2025 Wishes | দশমীর আন্তরিক শুভেচ্ছায় ভরে উঠুক সম্পর্কের আবহ : দুর্গা পূজা ২০২৫-এ প্রিয়জনকে পাঠান বিশেষ বার্তা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment