সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিজেপির (Bharatiya Janata Party -BJP) সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে নিতিন নবীন (Nitin Naveen) -এর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দলীয় ঐক্য, সংগঠনের চরিত্র এবং নেতৃত্বের দর্শন পরিষ্কার করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। বক্তব্যের একেবারে শুরুতেই নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে মোদী বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব গ্রহণ করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু নিতিন নবীন তাঁর উপর অর্পিত প্রতিটি দায়িত্বেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন।’
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বিজেপির সংগঠনিক শক্তির প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতিকে ‘১০০ শতাংশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়’ বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘এই দল ব্যক্তি নির্ভর নয়, আদর্শ নির্ভর। জনসেবা এবং রাষ্ট্র সেবাই আমাদের সংগঠনের ভিত্তি।’ বক্তব্যে তিনি বারবার ফিরে যান দলের শিকড়ে, লালকৃষ্ণ আদবানি (Lal Krishna Advani), অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee), মুরলী মনোহর যোশী (Murli Manohar Joshi) -এর নেতৃত্বে কী ভাবে বিজেপি শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছেছিল, সেই ইতিহাসের কথাও স্মরণ করান। মোদীর কথায়, নেতৃত্ব বদলালেও দলের দিশা বদলায় না। তাঁর ভাষায়, ‘বিজেপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বিজেপি একটি সংস্কার, একটি পরিবার। এখানে মেম্বারশিপের থেকেও বেশি গুরুত্ব পায় রিলেশনশিপ।’ তিনি বলেন, বিজেপিতে দায়িত্ব আসে ও যায়, কিন্তু আদর্শ অটুট থাকে। সেই আদর্শের কেন্দ্রে রয়েছে, ‘নিজের থেকে বড় দল, আর দলের থেকেও বড় দেশ।’
নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বলতে গিয়ে মোদী যে মন্তব্য করেন, তা মুহূর্তের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারি, তৃতীয়বার সেই দায়িত্ব পালন করছি। ৫০ বছরের কম বয়সে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছি, এই সব পরিচয় এক জায়গায় আছে। কিন্তু এর থেকেও বড় পরিচয় হল, আমি বিজেপির একজন কার্যকর্তা।’ এই বক্তব্যের পরেই তিনি উল্লেখ করেন, ‘দলের ক্ষেত্রে আমি একজন কার্যকর্তা, আর নিতিন নবীন আমার বস।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে মোদী কার্যত দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আনুগত্যকেই সামনে আনেন। নতুন সভাপতি নিতিন নবীনের প্রজন্মগত বৈশিষ্ট্য নিয়েও কথা বলেন মোদী। তিনি বলেন, ‘নিতিন নবীন সেই প্রজন্মের মানুষ, যিনি ছোটবেলায় রেডিও দেখেছেন, আর আজকের দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করছেন।’ এই তুলনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, বিজেপির নেতৃত্ব সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তিকে গ্রহণ করছে, কিন্তু শিকড়কে ভুলে যাচ্ছে না।
দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরতেও ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, জে পি নাড্ডা (J P Nadda) -এর নেতৃত্বে বিজেপি পঞ্চায়েত থেকে পার্লামেন্ট, সব স্তরেই নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। তাঁর দাবি, ‘অনেকদিন ক্ষমতায় থাকলে সাধারণত মানুষের আস্থা কমে যায়। কিন্তু বিজেপি সেই ট্রেন্ড ভেঙে দিয়েছে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি গুজরাট (Gujarat), মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh), মহারাষ্ট্র (Maharashtra) এবং বিহার (Bihar) -এর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে আগের তুলনায় বেশি ভোট পেয়ে বিজেপি ক্ষমতায় ফিরেছে। পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) ও তেলঙ্গানা (Telangana)-র প্রসঙ্গেও বিশেষভাবে কথা বলেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, ‘এই দুই রাজ্যে বিজেপি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে এসেছে।’ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও বিজেপি কী ভাবে বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে, সেই কথাই তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, গত দেড় থেকে দুই বছরে বিজেপির উপর মানুষের ভরসা আরও বেড়েছে। বিধানসভা থেকে লোকসভা, সব ক্ষেত্রেই দলের ‘স্ট্রাইক রেট’ আগের তুলনায় অনেক বেশি।

মোদী তাঁর বক্তব্যে দলের কর্মসংস্কৃতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মসংস্কৃতি সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলার। যাদের কথা কেউ গুরুত্ব দেয় না, তাদের গুরুত্ব দেওয়া, এটাই আমাদের রাজনীতি।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, বিজেপি যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখনও তারা আদর্শ থেকে সরে আসেনি। ক্ষমতা আসা-যাওয়ার বিষয়, কিন্তু আদর্শ স্থায়ী, এই বার্তাই তিনি বারবার দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিতিন নবীনের শপথ গ্রহণ মঞ্চ থেকে মোদীর সংগঠনের ভিত আরও মজবুত করার একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ। নিজের ‘প্রধানমন্ত্রী’ পরিচয়ের থেকেও ‘কার্যকর্তা’ পরিচয়কে বড় করে দেখিয়ে মোদী বুঝিয়ে দিলেন, বিজেপির রাজনীতিতে ব্যক্তি নয়, সংগঠনই শেষ কথা। সামনে একাধিক রাজ্য নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতির চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে এই বার্তা বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chhattisgarh road network, rural road development | ২৫ বছরে সড়ক উন্নয়নে ব্যাপক উন্নতি ছত্তিশগড়ে: ৪৮ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা থেকে অর্থনৈতিক করিডর, উন্নয়নের নতুন মানচিত্র




