সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতবর্ষের ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের সকালে দিল্লির কর্তব্যপথ যেন শুধু কুচকাওয়াজের মঞ্চই হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছিল ভারতের বহুমাত্রিক পরিচয়ের জীবন্ত উপস্থাপনা। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একেবারে নতুন ভূমিকায় ধরা দিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। রাষ্ট্রনেতার পরিচিত আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন ভারতের সংস্কৃতি, সামরিক শক্তি ও উন্নয়নযাত্রার ধারাভাষ্যকার। গোটা অনুষ্ঠানের বেশির ভাগ সময় জুড়ে ভিন্দেশি অতিথিদের উদ্দেশ্যে নিজ ভাষায় তাঁকে ভারতের গল্প তুলে ধরতে দেখা গেল। দোভাষীর মাধ্যমে সেই বক্তব্য ইউরোপীয় অতিথিদের কাছেও পৌঁছে যায়, আর তাতেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সোমবার সকাল থেকেই কর্তব্যপথ ও তার আশপাশের এলাকায় ছিল অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বহুস্তরীয় নজরদারিতে ঢেকে ফেলা হয়েছিল গোটা দিল্লি। সকালেই সেখানে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর পরনে ছিল নীল-সাদা কুর্তা-পাজামা, ফিকে নীল জওহর কোট এবং মাথায় উজ্জ্বল লাল রঙের পাগড়ি। জারদৌসি কারুকাজে সাজানো সেই পাগড়িতে ধরা পড়েছিল ভারতের বহুরঙা ঐতিহ্যের ছাপ। পোশাকের মধ্য দিয়েই যেন প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরলেন দেশের সংস্কৃতির গভীরতা ও বৈচিত্র।ঐতিহ্যবাহী শকটে করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (Droupadi Murmu), ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিয়ো লুই সান্তোস ডি কোস্টা (Antonio Luís Santos da Costa) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন (Ursula von der Leyen)। জাতীয় যুদ্ধস্মারকে শহীদ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও নীরবতা পালনের পর তাঁরা সবাই একসঙ্গে কর্তব্যপথের মূল মঞ্চে উপস্থিত হন। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বাজে জাতীয় সঙ্গীত, আর তার পরেই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ওঠে ২১ বার তোপধ্বনিতে। সেই মুহূর্তে গোটা কর্তব্যপথ দেশপ্রেমের আবেশে ভরে ওঠে।সাড়ে দশটা নাগাদ শুরু হয় কুচকাওয়াজের মূল অনুষ্ঠান। বিজয় চক থেকে যাত্রা শুরু করে ঐতিহাসিক লালকেল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত এই কুচকাওয়াজ সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ভারতের সামরিক শক্তির ঝলক দেখাতে শুরুতেই অংশ নেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বায়ুসেনা। টি-৯০ ভীষ্ম এবং মেন ব্যাটল ট্যাঙ্ক অর্জুনের গর্জনে কর্তব্যপথে তৈরি হয় শক্তির দৃপ্ত প্রকাশ। ট্রাকে করে প্রদর্শন করা হয় ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ও সূর্যাস্ত্র রকেট লঞ্চার সিস্টেম, যা ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার আধুনিক রূপকে তুলে ধরে।
ক্যাপ্টেন অহন কুমারের (Captain Ahan Kumar) নেতৃত্বে কুচকাওয়াজ করে ভারতীয় সেনার ঐতিহ্যবাহী ৬১তম অশ্বারোহী বাহিনী। তাদের শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা দর্শকদের মন জয় করে নেয়। পাশাপাশি ভারতীয় বায়ুসেনার বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। গত মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলিই এদিন আবার আকাশে ওড়ে। ঠিক সেই অভিযানের রণসজ্জায়, দেশের তেরঙা পতাকা বহন করে রাফাল, মিগ-২৯, সুখোই-৩০ ও জাগুয়ার-সহ মোট সাতটি যুদ্ধবিমান দিল্লির আকাশে দাপিয়ে বেড়ায়। আকাশে তাদের সমন্বিত উড়ান যেন ভারতের আকাশসীমায় অদম্য আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে।এই বর্ণময় আয়োজনের মাঝেই নজর কাড়ে সংস্কৃতি মন্ত্রকের বিশেষ ট্যাবলো। ‘বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর’ থিমে নির্মিত এই ট্যাবলোতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাতীয় চেতনার দীর্ঘ পথচলার গল্প তুলে ধরা হয়। শিল্প, সংগীত ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে তৈরি এই উপস্থাপনা বিদেশি অতিথিদের কাছেও ভারতের আবেগ ও আদর্শকে স্পষ্ট করে তোলে।
২০২৬-এর এই সাধারণতন্ত্র দিবসের সবচেয়ে আলাদা দিক ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা। কেবল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, একজন সচেতন বর্ণনাকারী হিসেবে তিনি বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারতের সামগ্রিক ছবি তুলে ধরেন। সামরিক প্রদর্শনী থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা, সব কিছুর অর্থ ও প্রেক্ষাপট তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেন। এতে করে ভারতের বৈচিত্র, উন্নয়নযাত্রা ও শক্তির বার্তা আরও সহজে আন্তর্জাতিক অতিথিদের কাছে পৌঁছে যায়।
উল্লেখ্য, ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের এই আয়োজন শুধু একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল ভারতের আত্মপরিচয়ের এক জোরাল ঘোষণা। কর্তব্যপথে সেই দিন ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে উঠেছিল। আর সেই কেন্দ্রে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাষ্ট্রনায়কের পাশাপাশি আবারও হয়ে উঠলেন ভারতের কণ্ঠস্বর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mann Ki Baat, Narendra Modi | পরিবেশ, ভোটাধিকার ও ভারতীয় সংস্কৃতি : বছরের প্রথম ‘মন কী বাত’-এ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহুমুখী বার্তা




