তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বলিউডের ক্লাসিক যুগের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা মুমতাজ় (Mumtaz)। ষাট ও সত্তরের দশকের বলিউড মানেই একের পর এক সুপারহিট সিনেমা, আর সেগুলোর বড় অংশ জুড়ে ছিলেন এই লাস্যময়ী অভিনেত্রী। পর্দায় তাঁর হাসি, সংলাপ আর চোখের অভিব্যক্তি মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল গোটা দর্শকদের। তবে রূপোলি পর্দার ঝলমলে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একজন অন্য মুমতাজ়। সংগ্রামী, একা, অনুভূতিতে জর্জরিত একজন নারীর কাহিনি। সেই গল্পে প্রেম আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, ব্যথা আছে, আর আছে আত্মমর্যাদার কঠিন সিদ্ধান্ত।

মাত্র ১১ বছর বয়সে অভিনয় শুরু করেছিলেন মুমতাজ়। ‘ব্রহ্মচারী’ (১৯৬৮) ছবির মুক্তির পর তাঁর জনপ্রিয়তা চূড়ায় পৌঁছয়। সেই সময়েই শোনা যায়, তাঁর জীবনে এসেছেন একজন বিশেষ পুরুষ, অভিনেতা শম্মী কপূর (Shammi Kapoor)। ‘ব্রহ্মচারী’-তে দু’জনের রসায়ন দেখেই দর্শকমহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। বলিপাড়ায় কান পাতলেই শোনা যেত, ক্যামেরার আড়ালেও তাঁরা একে অপরের প্রতি দুর্বল ছিলেন। মুমতাজের প্রেমে পড়েছিলেন শম্মী। এতটাই গভীরভাবে, যে মুমতাজ়কে তৎক্ষণাৎ বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন নায়িকা। কারণ? শম্মী শর্ত দিয়েছিলেন, বিয়ের পর অভিনয় ছাড়তে হবে। তখন মুমতাজ়ের বয়স মাত্র ১৭। কেরিয়ারের শিখরে থাকা অভিনেত্রী এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

মুমতাজ় চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে। তাই শম্মীর প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন। তারপর আর দেরি করেননি শম্মী। ১৯৬৯ সালে গোহিল বংশের রাজকুমারী নীলা দেবীকে (Neila Devi) তিনি বিয়ে করেন। এরপর অনেক বছর কেটে যায়। ১৯৭৪ সালে মুমতাজ় বিয়ে করেন ব্যবসায়ী ময়ূর মাধবানিকে (Mayur Madhvani)। তবে এই বিয়ের পথও ছিল কাঁটায় ভরা। বিবাহিত জীবনের শুরুর দিকে একাধিকবার গর্ভপাতের যন্ত্রণায় ভুগেছেন মুমতাজ়। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। একটা সময় ছিল, যখন সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকতাম। শুধু শৌচালয়ে যাওয়ার জন্য উঠতাম। সকালে ইঞ্জেকশন, বিকেলে একগাদা ওষুধ।”
আরও পড়ুন : Aamir Khan, Kiran Rao | বিচ্ছেদের পরও একইরকম ঘনিষ্ঠতা! কিরণ ও আমিরের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন পরিচালক
শেষপর্যন্ত তিনি বহু কষ্টে দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু, সন্তানের মুখ দেখার পরও সংসারে শান্তি স্থায়ী হয়নি। ময়ূর মাধবানি এক সময় এক বিদেশিনির সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। কাজের সূত্রে বিদেশে গিয়ে তিনি সেই সম্পর্কে জড়ান। পরে নিজের ভুল বুঝে মুমতাজ়ের কাছে তা স্বীকারও করেন। এই স্বীকারোক্তি ভেঙে দেয় মুমতাজ়কে। একসময় তাঁর নিজের কাছেও পরকীয়া বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জীবনে যখন চারপাশে কাঁটার বাগান হয়, তখন কেউ একটা গোলাপ এগিয়ে দিলেও সেটা অসাধারণ লাগে। আমিও সেই স্রোতে ভেসে গিয়েছিলাম।” এমনকী মুমতাজ়ের কথায়, “আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। একা হয়ে পড়েছিলাম। দেশে ফিরে এসেছিলাম। একটা সম্পর্কে জড়াই। তবে সেটা খুব গভীর কিছু ছিল না। খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছিল, চলে গিয়েছিল।”

মুমতাজ়ের জীবনের নানা অধ্যায়ে বারবার এসেছে প্রেম আর বিতর্ক। রাজেশ খন্না (Rajesh Khanna)-র সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল। শুটিংয়ে তাঁদের আচরণ দেখে অনেকেই ভাবতেন তাঁরা প্রেমিক-প্রেমিকা। তবে এই দাবি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন মুমতাজ়। তাঁর মতে, রাজেশ ছিলেন খুব ভাল বন্ধু। শুধু তা-ই নয়, রাজেশ খন্নার তৎকালীন প্রেমিকার সঙ্গেও নাকি তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। বর্তমানে যখন মুমতাজ়কে ঘিরে পুরনো কাহিনি নতুন করে আলোচনায়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় একটাই বিষয়, জীবনে তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজের পথ। সমাজের ছকভাঙা নিয়মে বেঁধে না থেকে, এক স্বাধীন নারীর মতোই তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জীবন ও দাম্পত্য নিয়ে। কখনও কষ্ট পেয়ে, কখনও ভুল করে, আবার কখনও ভালবেসে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল। বলিউডের ইতিহাসে মুমতাজ় শুধু একজন অভিনেত্রী, একজন পরিণত, সংগ্রামী নারীর প্রতীক। তিনি ভালবাসতে জানতেন, ক্ষমা করতেও পারতেন, তবে হার মানতে কখনওই শেখেননি।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kajol : মা কাঁদলে ব্যথা পায় সন্তান, তাই মায়ের ছবি পছন্দ নয় নাইসা-যুগের




