মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : কলকাতার বর্ষাকাল মানেই আকাশ ভরা মেঘ, অবিরাম বৃষ্টি, আর বাতাসে আর্দ্রতার গন্ধ। রাস্তায় জল জমে থাকা বা স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল হয়ত এই মৌসুমের পরিচিত ছবি, কিন্তু গৃহস্থের জন্য আরেকটি বড় চিন্তার জায়গা হলো রান্নাঘর। বর্ষার এই উচ্চ আর্দ্রতায় খাবার সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, মশলায় ধরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, চাল বা ডালে জন্ম নেয় পোকা, শুধু তা-ই নয় ফ্রীজের ভেতরেও জমে যেতে পারে ছত্রাক (Mold)। ফলে এই সময়ে রান্নাঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, খাবার সুরক্ষিত রাখা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ।খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ঋতুপর্ণা মুখোপাধ্যায় বলেন, “বর্ষায় বাতাসে আর্দ্রতা এতটাই বেশি থাকে যে খাবার নষ্ট হয়ে যায়। তাই খাবার সংরক্ষণ ও রান্নাঘর জীবাণুমুক্ত রাখা এই সময়ে সবচেয়ে জরুরি।”
এই মরশুমে রান্নাঘর সুরক্ষিত রাখতে কিছু বুদ্ধিদীপ্ত উপায় রয়েছে যা গৃহস্থালীকে সুন্দর করবে। প্রথমত, মশলা সংরক্ষণে সামান্য চাল বা বড় দানার নুন দিয়ে রাখলে আর্দ্রতা ঢুকতে পারে না। হলুদ, লঙ্কা বা ধনে গুঁড়োর মতো গুঁড়ো মশলাগুলি সহজেই স্যাঁতসেঁতে হয়ে দলা পাকিয়ে যায়, যা স্বাদ ও গুণমান নষ্ট করে। একইভাবে শুকনো লবঙ্গ (Clove) বা তেজপাতা (Bay Leaf) মশলার বয়ামে দিলে তা প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্রতা ও পোকা প্রতিরোধ করে।
আবার চাল, ডাল, বিস্কুট, শুকনো ফল সবই রাখতে হবে ভাল মানের এয়ারটাইট কন্টেনারে (Airtight Container)। এই কন্টেনার শুধু আর্দ্রতা আটকায় না, পোকা বা অন্যান্য জীবাণু ঢোকার সম্ভাবনাও কমায়। ফ্রীজে বর্ষাকালে দুর্গন্ধ বা ছত্রাক দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সপ্তাহে অন্তত একবার ফ্রীজ পরিষ্কার করে এক বাটি বেকিং সোডা (Baking Soda) বা কাটা লেবু রেখে দিলে দুর্গন্ধ শোষিত হয়। রান্নাঘরের তাক বা বয়ামেও সামান্য বেকিং সোডা রাখলে আর্দ্রতা কমে ও পরিবেশ সতেজ থাকে।
বর্ষার দিনে রান্নাঘরের সিঙ্কে ছত্রাক, দুর্গন্ধ বা জ্যাম হয়ে যাওয়া এড়াতে প্রতিদিন একবার গরম জল ঢেলে দেওয়া ভাল। পাশাপাশি, ভাল মানের এক্সজস্ট ফ্যান (Exhaust Fan) ব্যবহার করলে রান্নার ধোঁয়া ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা বেরিয়ে গিয়ে রান্নাঘর শুকনো থাকে। অনেকেই বর্ষায় ভাজা খাবার দীর্ঘদিন রাখতে চান। এর জন্য ডাবল ফ্রাই পদ্ধতি কার্যকর, প্রথমে হালকা ভেজে ঠাণ্ডা করে পরে আবার ভাজা। আলু ও পেঁয়াজ কখনও একসঙ্গে রাখবেন না, বর্ষাকালে এতে পচনের গতি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়।
কাপড় শুকানোর জন্য রান্নাঘর ব্যবহার করাটা বড় ভুল। ভিজে কাপড় ঝুলিয়ে রাখলে আর্দ্রতা আরও বেড়ে ছত্রাক জন্মায়। রান্নাঘরের তোয়ালে বা ঝাঁটা প্রতিদিন ব্যবহারের পর রোদে শুকিয়ে রাখা উচিত। খাবারে পোকা প্রতিরোধে তাক ও কৌটায় নীমপাতা (Neem Leaf) বা লবঙ্গ রাখা যায়। চা পাতা ও কফি ভালভাবে শুকিয়ে রাখলে ছত্রাকের আশঙ্কা থাকে না। আর ঘরের এক কোণে ইউক্যালিপটাস তেল (Eucalyptus Oil) বা কর্পূর রাখলে শুধু পোকা দূর হয় তা-ই না, মনোরম ঘ্রাণও বজায় থাকে।
আবার খাবার সংরক্ষণের পাশাপাশি রান্নাঘরের মেঝে জীবাণুমুক্ত রাখাও জরুরি। সপ্তাহে অন্তত দু’বার ভিনেগার (Vinegar) মিশিয়ে মেঝে ও তাক মুছলে জীবাণু ও স্যাঁতসেঁতে গন্ধ দূর হয়। রান্নার পরপরই কড়াই বা হাঁড়ি ধুয়ে ফেললে কালচে দাগ বা ফাঙ্গাস (Fungus) হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। ফাটা প্যাকেটে সহজেই আর্দ্রতা ঢুকে খাবার নষ্ট করে দিতে পারে। তাই কাঁচি দিয়ে কেটে ব্যবহার করা এবং অবশিষ্ট অংশ ভালভাবে সিল করে রাখা জরুরি। ক্যান বা টিনজাত খাবারের ঢাকনা খোলার পর অবশ্যই ফ্রীজে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বর্ষায় অযথা বেশি খাবার রান্না না করে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই রান্না করুন। কারণ এই মৌসুমে রান্না করা খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ নিরাপদ নয়।
অনেকেই মজা করে বলেন, “বর্ষায় রান্নাঘর সামলানো মানে যেন প্রতিদিন একধরনের যুদ্ধ! কিন্তু এই ছোট ছোট নিয়ম মেনে চললে খাবার যেমন ভালো থাকে, তেমনি রান্নাঘরেরও হাসি ফোটে।” আসলে কলকাতার বর্ষাকাল একদিকে যেমন মন ভোলানো, অন্যদিকে রান্নাঘর ও খাবার সংরক্ষণের জন্য বাড়তি যত্ন নেওয়া অপরিহার্য। এই পরীক্ষিত ২০টি উপায় শুধু রান্নাঘরের স্বাস্থ্য বজায় রাখবে না, তা পরিবারের সুস্থতারও সুরক্ষা দেবে। তাই বর্ষা উপভোগ করুন, আর আপনার রান্নাঘরকেও রাখুন ঝকঝকে, সুগন্ধি ও নিরাপদ।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Darbaari Mutton recipe | নবাবি দরবারী মটন, সহজ রেসিপিতে রাজকীয় স্বাদ




