সাশ্রয় নিউজ ★ বহরমপুর : বহরমপুর থেকে তিন দিনের সম্মেলনের শেষে পশ্চিমবঙ্গের বাম যুব রাজনীতিতে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে ডিওয়াইএফআই-এর (DYFI) মুখ হয়ে ওঠা মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (Minakshi Mukherjee) আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন রাজ্য সম্পাদক পদ থেকে। তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে সংগঠনের শীর্ষ দায়িত্বে আসীন হলেন তরুণ যুব নেতা ধ্রুবজ্যোতি সাহা (Dhrubajyoti Saha)। সভাপতি পদে নির্বাচিত হলেন পূর্ব বর্ধমানের অয়নাংশু সরকার (Ayanshu Sarkar)। তবে, মুখপত্রের সম্পাদক পদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করতে হল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটকে। সেই জায়গাতেই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে উঠে এলেন হাওড়ার নেতা সরোজ দাস (Saroj Das)।

ডিওয়াইএফআই-এর এবারের রাজ্য সম্মেলনে তিন দিনের দীর্ঘ আলোচনায় উঠে আসে একাধিক সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রসঙ্গ। বিশেষ করে বুথ স্তরের শাখা কমিটির অনুপস্থিতি বা নিষ্ক্রিয়তার কারণে জেলা স্তরে সংগঠনের বিস্তারে যে টানাপোড়েন দেখা দিচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তিত প্রতিনিধিরা। সম্মেলন শেষে এক জেলা প্রতিনিধি বলেন, ‘‘ভোটের অঙ্কে সংগঠনের বিস্তার স্পষ্ট হচ্ছে না। মাঠে-ময়দানে লড়াই বাড়লেও ভোট বাক্সে সেই প্রতিফলন আসছে না।’’ এই প্রেক্ষিতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নেতৃত্বের রদবদল। ধ্রুবজ্যোতি (Dhrubajyoti) এতদিন সভাপতি পদে থাকলেও সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার ফলে তাঁর কাঁধে পড়ল অনেক বড় বোঝা। মীনাক্ষী তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থাই রেখেছেন, তা স্পষ্ট তাঁর বিদায় বক্তব্যেই, ‘‘ধ্রুবর মতো সংগঠককেই এখন দরকার যুব সংগঠনের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য।’’
ধ্রুব এবং অয়নাংশুর আগমন অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। জট তৈরি হয়েছিল মুখপত্রের সম্পাদক পদ ঘিরে। দলের এক সূত্র জানায়, দক্ষিণবঙ্গের এক নেতা, যিনি সাম্প্রতিক নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁর নাম উঠে আসে এই পদে। তবে তা নিয়েই তৈরি হয় অস্বস্তি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে হাওড়ার সরোজ দাসকেই সামনে আনে আলিমুদ্দিন। এই সিদ্ধান্তে নেতৃত্বে ‘ক্লিন ইমেজ’ বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে সিপিআই (এম)। পাশাপাশি, মীনাক্ষীর সংগঠন থেকে সরে দাঁড়ানো যে একটি যুগের অবসান ঘটাল, তা নিয়েও দ্বিমত নেই দলের অন্দরেই। তিনি শুধু যুব সংগঠনের নয়, বাম রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন গত ক’য়েক বছরে। বিশেষত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কলকাতার ব্রিগেড সমাবেশে তাঁর ডাকে গড়ের মাঠ ভরে উঠেছিল, এমনটাই দাবি করছেন আলিমুদ্দিনের এক বর্ষীয়ান নেতা। তাঁর কথায়, ‘‘মীনাক্ষী এখন নিজেই একটা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।’’ এই জনপ্রিয়তা এবং লড়াকু ভাবমূর্তির প্রভাব থেকে কত দ্রুত বেরিয়ে নতুন নেতৃত্ব নিজস্ব ছাপ ফেলতে পারবে, তা নিয়েই প্রশ্ন থাকছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষত যেখানে যুব সমাজের বড় অংশ এখনও তৃণমূল বা বিজেপির দিকে ঝুঁকে রয়েছে, সেখানে ডিওয়াইএফআই (DYFI)-এর পক্ষে মাটির সংযোগ বাড়ানো কঠিন কাজ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল।
অন্যদিকে এবারের সম্মেলনে এই সংযোগের অভাবও উঠে এসেছে বহু প্রতিনিধির কণ্ঠে। অনেক জেলা থেকে অভিযোগ উঠেছে, ছাত্র-যুব রাজনীতির মাঝে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যার ফলে শাখা কমিটি ভেঙে পড়ছে বা একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এক প্রতিনিধি সরাসরি বলেন, ‘‘দলীয় লাইন ঠিক থাকলেও সংগঠনের প্রাণশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে জায়গায় জায়গায়।’’ এই প্রেক্ষিতে ধ্রুবজ্যোতির সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নতুন কর্মী তৈরি, বুথ স্তরের কাজকে শক্তিশালী করা এবং ভোটের রাজনীতিতে তার প্রভাব প্রতিফলিত করা। সেই সঙ্গে রয়েছে নেতৃত্বে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার চাপও। অন্যদিকে, মুখপত্রের দায়িত্বে সরোজ দাসকে আনা প্রসঙ্গে অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধুই বিতর্ক রুখতে নেওয়া ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’। তবে একইসঙ্গে অনেকে এটিকে ‘মেসেজিং’-এর অংশ হিসাবেও দেখছেন। সিপিআই(এম) চাইছে যুব সংগঠন থেকে এমন কোনও বার্তা না যাক, যা কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্বের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে। সব মিলিয়ে, বহরমপুর সম্মেলনের পরে ডিওয়াইএফআই এক নতুন দিশা খুঁজতে চলেছে। যেখানে পুরনো মুখ বিদায় নিচ্ছে, নতুনরা দায়িত্ব নিচ্ছে, আর দল চাইছে, সমস্ত বিতর্ক থেকে এক কদম দূরে থেকেই ভবিষ্যতের লড়াই শুরু হোক। তবে ভোটের রাজনীতিতে সেই লড়াই আদৌ কতটা প্রতিফলিত হবে, তা সময়ই বলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Meenakshi Mukherjee : লাল ঝণ্ডার মুখ: মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়




