তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই: ভারতের সমুদ্রপথ আজ শুধু পণ্য পরিবহনের রুট নয়, এটি এখন দেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ। বুধবার মুম্বইয়ে আয়োজিত Maritime Leaders’ Conclave-এ দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) জানালেন, “গত ১০ বছরে ভারতের মেরিটাইম সেক্টরে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এক কথায় ঐতিহাসিক।”
সোমবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) উদ্বোধন করেছিলেন ‘India Maritime Week’-এর। তারই অংশ হিসেবে বুধবারের এই কনক্লেভে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের ৮৫টি দেশের প্রতিনিধি, অসংখ্য গ্লোবাল মেরিটাইম সিইও, বিনিয়োগকারী, পলিসিমেকার, ইনোভেটর ও ইন্টারন্যাশনাল পার্টনাররা। সেই অর্থে এটি শুধু ভারতের নয়, বিশ্বমানের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী এদিন বলেন, “ভারতের মেরিটাইম সেক্টরে ১৫০-রও বেশি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, টেকসই ভবিষ্যতের দিকেও বড় পদক্ষেপ।” তিনি আরও জানান, পুরনো ও অচল মেরিটাইম আইনগুলি বাদ দিয়ে আধুনিক আইন কার্যকর করা হয়েছে, যার ফলে দেশের মেরিটাইম বোর্ডগুলির কাজ সহজ হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়েছে।
মোদীর ভাষায়, “ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা (coastline) আজ উন্নয়নের নতুন প্রতীক। মেরিটাইম সেক্টরে আমাদের অগ্রগতি শুধু দেশের ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের গ্লোবাল উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বে যেখানেই যাবেন, ভারতের জাহাজ দেখতে পাবেন। ভারত এখন নিজস্ব সাপ্লাই চেন শক্তিশালী করছে, বিশ্বমানের বন্দর গড়ে তুলছে।” উল্লেখ্য যে, কনক্লেভে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রিন শিপিং, সাপ্লাই চেইন রেজিলিয়েন্স, এবং সাস্টেইনেবল মেরিটাইম ইনোভেশন। ভারতের সমুদ্রপথ এখন আর কেবল রপ্তানি বা আমদানির মাধ্যম নয়, একে ভবিষ্যতের জ্বালানির উৎস হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মোদী জানান, “ভারত এখন ব্লু ইকোনমি (Blue Economy)-এর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রস্তুত। গ্রীন ফুয়েল, হাইড্রোজেন-ভিত্তিক শিপিং এবং ডিজিটাল লজিস্টিকসই আগামী দিনের পথ।”
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 | পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতির লড়াই-কে এগিয়ে? (আজ দ্বিতীয় কিস্তি)
মেরিটাইম সেক্টরের আধুনিকীকরণের পাশাপাশি মোদী সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হল ‘ক্রুজ ট্যুরিজম’-এর প্রসার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভারতে ক্রুজ ট্যুরিজম এখন দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। শুধু পর্যটনের ক্ষেত্রেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। আগামী দিনে ভারতকে গ্লোবাল ক্রুজ ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য।” অন্যদিকে, ভারতের মেরিটাইম সেক্টরের এই ব্যাপক পরিবর্তন মূলত শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের পর থেকে। Sagarmala Project-এর মাধ্যমে বন্দর উন্নয়ন, জলপথ সংযোগ বৃদ্ধি, এবং উপকূলীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই ধারাই এখন আরও গতি পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এদিনের বক্তব্যে বলেন, “দশ বছর আগে ভারত সমুদ্রপথে আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। আজ আমরা নিজেরাই তৈরি করছি জাহাজ, নিজেদের পোর্টে তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো। এটি আত্মনির্ভর ভারতের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে মোদী বলেন, “এই কনক্লেভ শুধু একটি ইভেন্ট নয়, এটি বিশ্ববাসীর কাছে ভারতের সংকল্পের প্রতিফলন। ভারতের মেরিটাইম ভিশন ২০৪৭ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি পরিবেশবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির রূপরেখা।”মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে ভারতের নতুন প্রজন্মের লক্ষ্য, টেকনোলজি, ইনোভেশন এবং সাসটেইনেবিলিটির মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতকে একটি Global Maritime Hub বানানো। তাঁর কথায়, “আমরা চাই ভারত হোক এমন একটি দেশ, যেখান থেকে বিশ্বের মেরিটাইম পলিসি প্রভাবিত হয়, শুধুমাত্র অনুসারী নয়, নেতৃত্বদানকারী।” এই কনক্লেভ চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। এর মধ্যেই ভারতের বন্দর উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগের দিকনির্দেশ, এবং ব্লু ইকোনমি প্রসারের জন্য একাধিক রোডম্যাপ প্রকাশ পাবে বলে সূত্রের খবর।
মোদী সরকারের গত এক দশকের নীতি বাস্তবায়ন : যেমন ‘Make in India’, ‘Maritime Vision 2047’, এবং ‘PM Gati Shakti’-র মতো উদ্যোগ ইতিমধ্যেই ভারতের মেরিটাইম ইকোসিস্টেমে নতুন গতি এনেছে। সমালোচকদের মতে, এই ধারাবাহিক উন্নয়ন ভারতকে আগামী দশকে বিশ্বের অন্যতম মেরিটাইম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এদিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভারতের সমুদ্র শুধু জল নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিফলন। এই সমুদ্র আমাদের স্বপ্নের দিগন্ত, যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ, এবং উদ্ভাবন একসাথে বয়ে চলে।”
ছবি : সংগৃহীত




