সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কৃষ্ণনগর : বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগরের জনসভা যেন পরিণত হল রাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ মঞ্চে। ব্রিগেডে প্যাটিস বিক্রেতাদের মারধরের ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন বিজেপিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে (Amit Shah) এবং নির্বাচন কমিশনকেও (Election Commission of India)। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “এটা বাংলা, এটা ইউপি নয়। এখানে গরিব মানুষের ওপর হাত তুললে একটাও ছাড় দেওয়া হবে না।”
উল্লেখ্য যে, গত রবিবার ব্রিগেডে গীতাপাঠ অনুষ্ঠান চলাকালীন ময়দানে দু’জন প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তাল রাজনীতি। আর সেই বিতর্কেরই তীব্র প্রতিধ্বনি শোনা গেল কৃষ্ণনগরের সভায়। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করেন, “এক জন গরিব হকার শুধু তার খাবার বিক্রি করতে গিয়েছিল। তাকে ধরে মেরেছে। যারা গায়ে হাত দিয়েছে, সব ক’টাকে অ্যারেস্ট (Arrest) করেছি। এটা বাংলা। এখানে বাইরের রাজ্যের মতো দাদাগিরি দেখানো যাবে না। যে ভাববে এখানে এসে গুণ্ডামি করবে, তাকে আইনের মুখোমুখি করব।”
ব্রিগেডের ওই ঘটনায় প্যাটিস বিক্রেতা মহম্মদ সালাউদ্দিন (Mohammad Salauddin) এবং শেখ রিয়াজুল (Sheikh Riajul) অভিযোগ দায়ের করেছিলেন ময়দান থানায়। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের তরফে দুটি আলাদা এফআইআর রুজু হয়। ঘটনার ভিডিয়ো-ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সেগুলি খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত তিন জন: সৌমিক গোলদার (Saumik Goldar), স্বর্ণেন্দু চক্রবর্তী (Swarnendu Chakraborty) এবং তরুণ ভট্টাচার্যকে (Tarun Bhattacharya) গ্রেফতার করা হয়েছে। সৌমিকের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙায়, স্বর্ণেন্দুর ঠিকানা অশোকনগর এবং তরুণ থাকেন হুগলির উত্তরপাড়ায়। পুলিশ সূত্রের খবর, এই তিন জনের বিরুদ্ধে আরও ধারায় মামলা যোগ করারও কথা ভাবা হচ্ছে।
কৃষ্ণনগরের সভা থেকে বিজেপিকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, “এদের চরিত্রটাই এমন যে যেখানে যায়, সেখানে বিশৃঙ্খলা বাধায়। ব্রিগেডে গীতাপাঠের নামে নাটক করে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে।” তারপরেই তিনি কটাক্ষ ছুঁড়ে দেন, “এটা বাংলা! এখানে কারও ওপর হাত তুললে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হবে।” এদিনের সভায় এসআইআর (SIR) নিয়েও ফের একবার বিজেপিকে একহাত নেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বলছে দেড় কোটি লোকের নাম বাদ দিতে হবে। কারও নাম বাদ দিলে ধর্না দিয়ে বসব। যতক্ষণ না নাম তোলা হচ্ছে, তত ক্ষণ ধর্না করব।” এরপর তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যোগ করেন, “বিহার পারেনি, বাংলা পারবে! বিজেপি যা-ই চেষ্টা করুক, এখানে কিছুই করতে পারবে না।”
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে মমতার কটাক্ষ আরও তীক্ষ্ণ। তিনি বলেন, “বিএসএফের (BSF) ধারেকাছে যাবেন না! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক চোখে দুর্যোধন, আর এক চোখে দুঃশাসন। বাইরে থেকে ভয় দেখালেই কি বাংলার মানুষ ভয় পাবে? ভুলে গিয়েছে বিজেপি, বাংলা মাথা নোয়ানো রাজ্য নয়।” এর পাশাপাশি তিনি বার্তা দেন যে, রাজ্যে কোনওভাবেই ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করতে দেওয়া হবে না। তাঁর কথায়, “এ রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না। বাংলা মানবিকতার জায়গা। এখানে নাগরিকদের ভয় দেখানোর রাজনীতি চলে না।” সভায় নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিজেপির আইটি সেলের তৈরি করা তালিকা দিয়ে ভোট করাবেন? যা ইচ্ছে করুন, কিছু করতে পারবেন না। কমিশন নিজের দায়িত্ব পালন না করলে আমরা আইনানুগ পথে লড়াই করব।”
এদিনের বক্তব্যে মমতার গলায় ছিল আক্রমণ, সতর্কতা এবং রাজনৈতিক যুদ্ধের সুর। আগামী নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রশাসন থেকে রাস্তাঘাট, সব জায়গাতেই লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ব্রিগেডের প্যাটিস বিতর্ক মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে এক নতুন গতি পেল। ব্রিগেডে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস (CV Ananda Bose) এবং বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের উপস্থিতির মধ্যেই ঘটে যায় ওই মারধরের ঘটনা। এক প্যাটিস বিক্রেতাকে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিয়ো ভাইরাল হয়। এই দৃশ্যের পরেই নড়ে বসে প্রশাসন। তদন্তে নেমে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়। রাজ্যপাল যদিও এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি, তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যপালের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটল কীভাবে? মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, বাংলায় গরিব, শ্রমজীবী মানুষের ওপর হামলা করলে ছাড় নেই। আর বিজেপি যদি এসআইআর নিয়ে ‘নাম কাটা’র রাজনীতি করতে চায়, তবে রাস্তায় নেমেই লড়াই করবেন তিনি। কৃষ্ণনগরের সভায় তাঁর বক্তব্য যেন নির্বাচনী লড়াইয়ের এবারের মূল সুর আরও তীব্র করে তুলল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee on Assam NRC | ‘অসমের বাংলায় চিঠি পাঠানোর অধিকার নেই, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখালে কড়া ব্যবস্থা’ : কোচবিহার থেকে সতর্কবার্তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




