সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : কেরলের নাম পরিবর্তনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিলমোহর পড়ার পর নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দক্ষিণের রাজ্য কেরল -এর বদলে ‘কেরলম’ নাম অনুমোদিত হওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়)। তাঁর বক্তব্য, কেরলে Bharatiya Janata Party (বিজেপি) ও Communist Party of India (Marxist) (সিপিএম)-এর যোগ এখন আর অলিখিত নেই, এখন লিখিত’। সেই কারণেই কেরলের নাম পরিবর্তনের অনুমোদন মিলেছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। পাশাপাশি স্পষ্ট বার্তা, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার দাবি থেকে তিনি সরে আসবেন না। উল্লেখ্য, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কেরলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। ভোটের আবহে কেরলের নতুন নাম ‘কেরলম’ -এ অনুমোদন মেলায় রাজনৈতিক মহলে চর্চা তীব্র হয়েছে। এই প্রেক্ষিতেই মমতার প্রশ্ন, ‘আমাদের দীর্ঘ দিন ধরে ওয়াই-জ়েডে পড়ে থাকতে হয় কেন?’ তাঁর দাবি, বর্ণানুক্রমিক তালিকায় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজ্যকে পিছনে পড়তে হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজ্যের ছেলে-মেয়েরা যখন পরীক্ষা দিতে যায়, তখন তাদের পিছনের বেঞ্চে বসতে হয়। আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কোথাও গেলে আমাকে সবার শেষে সুযোগ দেওয়া হয় এই নামের বর্ণানুক্রমে।’
মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব একাধিক বার বিধানসভায় গৃহীত হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘বাংলার সংস্কৃতি, সভ্যতা, মননশক্তি, চিন্তা, দর্শন সব ভেবে রাজ্যটার নাম বাংলা করতে চেয়েছিলাম। বিধানসভায় দু’ থেকে তিন বার প্রস্তাব পাশ করেছি। আপনারা দেননি।’ প্রথম প্রস্তাবে কেন্দ্রের আপত্তির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তখন বলা হয়েছিল তিন ভাষায় নামের একরূপ রাখতে হবে। ‘ওরা বলল, নামটাকে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি তিনটি ভাষায় এক শব্দ এক করে দিন। তখন আমরা আবার বিধানসভায় পাশ করালাম। হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা- তিন ভাষাতেই বাংলা করা হয়,’ বলেন তিনি। তার পরেও অনুমোদন না মেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় বিষয়টি বারবার তুলেছেন। তবু অগ্রগতি হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ‘কেন জানি না! ওরা বাংলাবিরোধী বলেই আমার মনে হয়। ওরা বাংলার মনীষীদের অসম্মান করে। বাংলা কথাটা নির্বাচনের সময় ভোটের জন্য বলে। কিন্তু ওরা বাংলাবিরোধী। সেই জন্য বাংলা নামটা করল না।’
অন্য রাজ্যের নাম পরিবর্তনে তাঁর আপত্তি নেই বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অন্য রাজ্যের নাম পরিবর্তন করুক। আমরা ফ্লেক্সিবল। আমরা কোনও রাজ্যের বিরোধী নেই। সব রাজ্যকে ভালবাসি।’ তবে কেরলের অনুমোদন প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘ওরা পেয়ে গেল, কারণ আজ কেরলে বিজেপির সঙ্গে সিপিএমের জোট গড়ে উঠছে বলে। অলিখিত যোগ নয়, এটা এখন লিখিত যোগ। আজকের ঘটনা তার প্রমাণ।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘বাংলা বঞ্চিত হবে কেন বার বার?’ একই সঙ্গে ঘোষণা, ‘এক দিন তো আপনারা চলে যাবেন! বাংলার নামটা কিন্তু আমরা আদায় করে ছাড়ব।’ উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব গৃহীত করে। রাজ্য সরকারের যুক্তি ছিল, বাংলা নামটি রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। তবে কেন্দ্রের তরফে বিদেশ মন্ত্রক আপত্তি তোলে, কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র Bangladesh-এর সঙ্গে নামের সাদৃশ্য তৈরি হতে পারে। সেই সূত্রেই প্রস্তাবটি ঝুলে রয়েছে। এখনও তা খারিজ হয়নি, আবার চূড়ান্ত অনুমোদনও মেলেনি।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনও রাজ্যের নাম পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভায় প্রস্তাব গৃহীত হয়। তার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে। প্রয়োজন হলে রেল, ডাক বিভাগ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দফতরের মতামত নেওয়া হয়। অনুমোদনযোগ্য মনে হলে সংসদে বিল আকারে তা পেশ করা হয়। সংসদের দুই কক্ষে বিল গৃহীত হলে রাষ্ট্রপতির সম্মতির মাধ্যমে নাম পরিবর্তন কার্যকর হয়। কেরলের ক্ষেত্রে সেই পথেই এগিয়েছে প্রক্রিয়া। কেরল সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, মালয়লাম ভাষায় রাজ্যের নাম ‘কেরলম’। সংবিধানের প্রথম তফসিলে ইংরেজি রূপ ‘কেরল’ থাকলেও স্থানীয় ভাষার পরিচিত রূপ প্রতিফলিত করতেই পরিবর্তনের আর্জি জানানো হয়। অষ্টম তফসিলেও নাম সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। সেই প্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্মতি দেয়।এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গ আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের আগে এই ইস্যু ঘিরে চাপানউতোর আরও বাড়তে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি ছাড়ছেন না। তাঁর কথায়, ‘বাংলার নাম বাংলা হবেই। আমরা সেই অধিকার আদায় করব।’
রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এটি শুধুই নামের প্রশ্ন নয়, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। বিরোধী শিবির অবশ্য দাবি করেছে, নাম পরিবর্তন নয়, উন্নয়নই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। তবে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট, এই ইস্যুতে তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় অবস্থানই বজায় রাখবেন। অন্যদিকে, কেরলের ‘কেরলম’ অনুমোদনের পর জাতীয় রাজনীতিতে যে সুর চড়েছে, তার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পড়তে চলেছে। নাম পরিবর্তন নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের টানাপোড়েন কত দূর গড়ায়, তা সময়ই বলবে। তবে মমতার ঘোষণা, ‘বাংলা’ নামের দাবিতে তিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন, এই বার্তা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee KIFF 2025 speech, Kolkata Film Festival closing ceremony | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশি পরিচালকদের বাংলায় আহ্বান জানালেন




