সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: কয়েক মিনিটের জন্য বদলে গিয়েছিল সংসদের চেনা ছবি। যেখানে দিনের পর দিন স্লোগান, বিক্ষোভ, হইচই আর অধিবেশন মুলতুবির ঘটনা ছিল নিয়মিত, সেখানেই বৃহস্পতিবার মাত্র ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ অন্য রকম পরিবেশ দেখা যায়। না ছিল রাজনৈতিক তর্ক, না ছিল একে অপরের বিরুদ্ধে স্লোগান, না ছিল কোনও ইস্যুতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি। লোকসভায় (Lok Sabha) তখন একসঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাওয়া হচ্ছিল ‘বন্দে মাতরম্’। আর সেই গান শেষ হওয়ার পরেই ঘোষণা হল বাদল অধিবেশনের সমাপ্তি। গোটা অধিবেশনের দিকে তাকালে ওই ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডকেই কার্যত সবচেয়ে শান্ত সময় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, বাদল অধিবেশনের প্রায় প্রতিটি দিনই কোনও না কোনও রাজনৈতিক ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়েছে সংসদ। কখনও বিরোধীদের প্রতিবাদ, কখনও সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান, আবার কখনও নির্দিষ্ট বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিবৃতির দাবিতে সরব হয়েছে বিরোধী শিবির। তার জেরে লোকসভা ও রাজ্যসভা বার বার মুলতুবি হয়েছে। সংসদের কাজ ব্যাহত হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে।
বৃহস্পতিবার ছিল বাদল অধিবেশনের শেষ দিন। সকাল থেকেই লোকসভায় পরিস্থিতি আগের দিনের মতনই উত্তপ্ত ছিল। সকাল ১১টার অধিবেশন শুরুর আগে সংসদে পৌঁছন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। তাঁকে দেখেই বিরোধী সাংসদেরা নানা স্লোগান দিতে শুরু করেন। পড়ুয়াদের উপর ২০ জুলাই পুলিশের লাঠিচার্জ এবং পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব দাবি করে সরব হন তাঁরা। বিরোধী সাংসদদের মুখে ওঠে ‘ক্ষমা চাইতে হবে’ স্লোগানও। এর কিছুক্ষণ পর সংসদে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তার পরেই শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীতের আবহে নয়, ‘বন্দে মাতরম্’ (Vande Mataram) -এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার পর্ব। শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষের সাংসদেরাই সেই গানে কণ্ঠ মেলান। কয়েক মিনিটের জন্য থেমে যায় রাজনৈতিক বিক্ষোভ। গান শেষ হওয়ার পর লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla) বাদল অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এই অধিবেশনের শুরু থেকেই বিরোধীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ২০ জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি। রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) -সহ বিরোধী শিবিরের একাধিক সাংসদ এই বিষয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়ে সরব হন। কার নির্দেশে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল, কোথা থেকে পেলেট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এসেছিল, এই প্রশ্নগুলির উত্তর চেয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু সেই দাবি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। ফলে অধিবেশনের একাধিক দিন লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিক্ষোভ চলেছে। কখনও বিরোধীরা ওয়েলে নেমে স্লোগান দিয়েছেন, কখনও স্পিকারের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। তার মধ্যেই সরকার একের পর এক বিল পাশ করিয়েছে। বাদল অধিবেশনে লোকসভায় মোট ১১টি বিল পাশ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিরোধীদের বিক্ষোভের মধ্যেই বেশ কয়েকটি বিল ধ্বনিভোটে অনুমোদিত হয়।
বিল পাশের সময় নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত বিল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও অন্য একাধিক বিল তুলনামূলক ভাবে খুব কম সময়ের মধ্যেই পাশ করানো হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ বিলের ক্ষেত্রে আলোচনা হয়েছে মাত্র কয়েক মিনিট। কিছু বিল ৩ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যেই পাশ হয়ে যায়। ফলে সংসদে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া কতটা বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পেয়েছে, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য দিকে, বাদল অধিবেশনে সংসদীয় কাজের পরিমাণের পরিসংখ্যানও প্রকাশ্যে এসেছে। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু (Kiren Rijiju) বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শেষ দিনে জানান, লোকসভায় কাজ হয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ সময়। রাজ্যসভায় কাজের হার তুলনায় বেশি, ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের বড় অংশই সংসদীয় আলোচনার বাইরে চলে গিয়েছে বিক্ষোভ ও মুলতুবির কারণে।
তবে সংসদের কাজের হার কমে যাওয়া নতুন ঘটনা নয়। অতীতের একাধিক অধিবেশনেও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দুই কক্ষে কাজের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে নেমেছে। পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের (PRS Legislative Research) তথ্য অনুযায়ী, ইউপিএ সরকারের আমলে ২০১০ সালের শীতকালীন অধিবেশনে লোকসভায় কাজের হার নেমে এসেছিল মাত্র ৫ শতাংশে। রাজ্যসভায় তা ছিল ২ শতাংশ। সে সময় ২জি স্পেকট্রাম দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে সংসদে তীব্র অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। ২০১৩ সালের শীতকালীন অধিবেশনেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সময় লোকসভায় কাজের হার ছিল ৬ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ১৯ শতাংশ। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বাজেট অধিবেশনেও কাজের হার খুব বেশি ছিল না। লোকসভায় তা ছিল ১৯ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ২৭ শতাংশ। এনডিএ সরকারের আমলেও একাধিকবার সংসদীয় কাজ ব্যাহত হয়েছে। ২০১৫ সালের বাদল অধিবেশনে ললিত মোদী (Lalit Modi) ও ব্যাপম (Vyapam) কাণ্ড নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বার বার মুলতুবি হয়েছিল দুই কক্ষ। সেই অধিবেশনে লোকসভায় কাজের হার ছিল ৪৬ শতাংশ। তবে রাজ্যসভায় তা নেমে গিয়েছিল মাত্র ৯ শতাংশে।
২০১৬ সালের শীতকালীন অধিবেশনেও নোটবন্দি নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার প্রতিবাদে সংসদ অচল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই সময় লোকসভায় কাজের হার ছিল ১৫ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ১৮ শতাংশ। ২০১৮ সালের বাজেট অধিবেশনে লোকসভা ও রাজ্যসভায় কাজের হার ছিল যথাক্রমে ২১ এবং ২৭ শতাংশ। ২০২১ সালের বাদল অধিবেশনেও পেগাসাস (Pegasus) নজরদারি বিতর্ক ও তিন কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে সংসদে ব্যাপক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সেই অধিবেশনে লোকসভায় কাজের হার ছিল ২১ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ২৯ শতাংশ। ২০২৩ সালের অধিবেশনেও দুই কক্ষের কাজের হার খুব বেশি ছিল না। লোকসভায় ৩৩ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ২৪ শতাংশ কাজ হয়েছিল বলে পিআরএসের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সংসদে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে কাজ ব্যাহত হওয়া নতুন কোনও প্রবণতা নয়। তবে চলতি বাদল অধিবেশনে ১৯ শতাংশ কাজের হার ফের সেই বিতর্ককে সামনে এনেছে, সংসদে প্রতিবাদের অধিকার এবং আইন প্রণয়নের কাজের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় থাকবে?
রাজনৈতিক ভাবে উত্তপ্ত একটি অধিবেশনের শেষ ছবিটিও তাই হয়ে রইল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক মিনিট আগে যেখানে স্লোগান আর প্রতিবাদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, সেখানেই ‘বন্দে মাতরম্’-এর সময় শাসক ও বিরোধী সাংসদদের কণ্ঠ একসঙ্গে মিলেছে। ছয়টি স্তবক শেষ হতে সময় লেগেছে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড। তার পরেই স্পিকারের ঘোষণায় শেষ হয়েছে বাদল অধিবেশন। অর্থাৎ, কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শেষে সংসদে সবচেয়ে নিরিবিলি সময়টি এল একটি দেশাত্মবোধক গানকে ঘিরে। কিন্তু গান থামার পরেই আবার সামনে রয়ে গেল সেই প্রশ্ন, আগামী অধিবেশনে কি রাজনৈতিক সংঘাত কমবে, নাকি ফের স্লোগান, প্রতিবাদ এবং মুলতুবির মধ্যেই হারিয়ে যাবে সংসদের কাজের বড় অংশ?
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Bengal speech | বেঙ্গালুরু থেকে বাংলার জয়ের গল্প শোনালেন নরেন্দ্র মোদী : ‘৩ থেকে ২০০+ বিধায়ক’, বিজেপির উত্থান ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা




