সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ, কলকাতা : কলকাতায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মহাতারকা লিয়োনেল মেসি -এর (Lionel Messi) আগমন ঘিরে যে স্বপ্নের উৎসবের ছবি আঁকা হয়েছিল, তা শনিবার মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল আতঙ্ক, ক্ষোভ ও ভাঙচুরের বিভীষিকায়। সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন (Salt Lake Stadium) কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দফায় দফায় জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ, গ্যালারি থেকে চেয়ার ও বোতল ছোড়া, মাঠে ঢুকে পড়া হাজার হাজার উত্তেজিত দর্শক, সব মিলিয়ে কলকাতার ক্রীড়া ইতিহাসে এক লজ্জাজনক অধ্যায় যুক্ত হল। এই ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের বাইরেও। শেষ পর্যন্ত লিয়োনেল মেসিকে কলকাতায় আনার মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে (Shatadru Dutta) বিমানবন্দর থেকে আটক করে পুলিশ। শনিবার সকাল থেকেই যুবভারতীর বাইরে ভিড় উপচে পড়ে। চড়া দামে টিকিট কেটে হাজার হাজার দর্শক অপেক্ষায় ছিলেন এক ঝলক মেসিকে দেখার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মেসি যুবভারতীতে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরেন। নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেঙে এই ভিড় চলে আসায় গ্যালারি থেকে মেসিকে দেখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু মেসিই নন, তাঁর সঙ্গে আসা লুইস সুয়ারেজ় (Luis Suárez) এবং রদ্রিগো ডি’পলকেও (Rodrigo De Paul) গ্যালারি থেকে দেখতে পাননি দর্শকরা।
এই অবস্থায় গ্যালারিতে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। একসময় তা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। ‘উই ওয়ান্ট মেসি’ স্লোগানে কেঁপে ওঠে যুবভারতী। অনেক দর্শক অভিযোগ করেন, হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কেটেও তাঁরা মেসিকে একবারের জন্যও দেখতে পেলেন না। সেই হতাশাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় আগ্রাসী ক্ষোভে। ঠিক ১১টা ৫২ মিনিট নাগাদ নিরাপত্তার স্বার্থে মেসিকে দ্রুত যুবভারতী থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেই মুহূর্তের পরেই পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যায়। ফেন্সিং ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়েন দু’ থেকে আড়াই হাজার মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে নামাতে হয় র্যাফ (RAF)। মাঠের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। গ্যালারি থেকে চেয়ার ও বোতল ছোড়া হতে থাকে। ভাঙা চেয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা।ক্ষুব্ধ জনতার তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় যুবভারতী স্টেডিয়ামের একাধিক অংশ। গোলপোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলা হয়, সাজঘরে যাওয়ার টানেলের ছাউনি ভেঙে দেওয়া হয়। মাঠের ধারে রাখা তাঁবুতে আগুন লাগানোর চেষ্টাও করেন কয়েক জন। শুধু মাঠের ভেতরেই নয়, স্টেডিয়ামের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। ইএম বাইপাসে লাঠি হাতে জনতাকে তাড়া করতে দেখা যায় পুলিশকে। জনতার একাংশের মুখে শোনা যায় ‘চোর-চোর’ স্লোগান। মেসির নাম সামনে রেখে দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগও তোলেন ক্ষুব্ধ দর্শকরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছবি সামনে আসে পরে। ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ যুবভারতী স্টেডিয়াম থেকে কার্যত ‘লুট’ চালায় বলে অভিযোগ। ঘাস, চেয়ার, এমনকি গাছের টব পর্যন্ত নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় কিছু দর্শককে। এই ঘটনা স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার পর সন্ধ্যায় বড় পদক্ষেপ করে প্রশাসন। লিয়োনেল মেসিকে (Lionel Messi) কলকাতায় আনার মূল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত শতদ্রু দত্তকে (Shatadru Dutta) বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার (Rajeev Kumar) নিজে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং যাঁরা এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিজি রাজীব কুমার (Rajeev Kumar) এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘দর্শকদের সঙ্গে যা হয়েছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। যাঁরা টিকিট কেটে এসেছিলেন, তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া উচিত।’ তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যদি টিকিটের টাকা ফেরত না দেওয়া হয়, তবে আইন অনুযায়ী কড়া পদক্ষেপ করা হবে। এই মন্তব্যের পরই গোটা ঘটনায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আরও জোরাল হয়েছে। মেসির মতো আন্তর্জাতিক তারকার সফর ঘিরে এমন বিশৃঙ্খলা শুধু রাজ্যের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং ভবিষ্যতে কলকাতায় বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। তদন্তে কী উঠে আসে, উদ্যোক্তাদের ভূমিকা কতটা দায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় গাফিলতি ছিল, সেদিকেই এখন তাকিয়ে ক্রীড়াপ্রেমী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lionel Messi in Kolkata, Mamata Banerjee apologises after Salt Lake Stadium chaos | কলকাতায় লিয়োনেল মেসি : যুবভারতী কাণ্ডে তোলপাড়, দর্শক ও ফুটবল-তারকার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




