শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেঙ্গালুরু: আইপিএল জয়ের উচ্ছ্বাসের মাঝেও নিজের ক্রিকেটজীবন, নেতৃত্ব, লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করলেন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (Royal Challengers Bangalore বা RCB) -এর পডকাস্টে সঞ্চালিকা মায়ান্তি ল্যাঙ্গার (Mayanti Langer) -এর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে তিনি তুলে ধরলেন তাঁর মানসিকতা, ক্রিকেট দর্শন এবং দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আইপিএল জয়ের প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য ইতিমধ্যেই ক্রিকেটমহলে আলোচনার কেন্দ্রে। কোহলি জানিয়েছেন, আইপিএল ট্রফি জয়ের অনুভূতি তাঁর কাছে বিশেষ হলেও সেটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। তিনি বলেন, ‘যদি আইপিএল না-ও জিততাম, তা হলেও সারাজীবন আক্ষেপে ভুগতাম না। তবে একটা অপূর্ণতা হয়তো থেকে যেত।’ এই কথাতেই উঠে আসে তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং খেলাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

গত মরসুমে বেঙ্গালুরুর আইপিএল জয়ের স্মৃতি নিয়ে কোহলি বলেন, ‘ফাইনালের শেষ ওভারের শেষ কয়েকটা বলের অনুভূতি এখনও ভাষায় বোঝানো কঠিন। এত বছরের চাপ, অপেক্ষা, সব একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল।’ প্রায় ১৮ বছরের প্রচেষ্টার পর এই সাফল্য আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ‘আগে যদি এই ট্রফি জিততাম, হয়তো এই আনন্দের মাত্রা এতটা হত না।’ শুধু আইপিএল নয়, টেস্ট ক্রিকেট নিয়েও স্মৃতিচারণ করেছেন কোহলি। ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সময়কালকে তিনি এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে একটা আলাদা মানসিকতা ছিল। তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে লড়াইয়ের ইচ্ছা ছিল প্রবল।’ তিনি চেতেশ্বর পুজারা (Cheteshwar Pujara), অজিঙ্ক রাহানে (Ajinkya Rahane), রবিচন্দ্রন আশ্বিন (Ravichandran Ashwin), ইশান্ত শর্মা (Ishant Sharma), মহম্মদ শামি (Mohammed Shami) এবং রবীন্দ্র জাডেজার (Ravindra Jadeja) নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা প্রায় একই বয়সের ছিলাম, ফলে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।’
২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি (MS Dhoni)-র অনুপস্থিতিতে প্রথম টেস্ট নেতৃত্ব পান কোহলি। সেই সময় থেকেই দলের ভিত গড়ে ওঠে বলে তাঁর ধারণা। তিনি বলেন, ‘দল হিসেবে আমরা নিজেদেরই চ্যালেঞ্জ দিতাম, কী ভাবে আরও ভালো হওয়া যায়, কী ভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সফল থাকা যায়।’ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলেন কোহলি। তরুণদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের খেলার ধরন আলাদা। যেমন গ্রেম স্মিথ (Graeme Smith)-এর ব্যাটিং নিখুঁত না হলেও তিনি সফল হয়েছেন। সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar) বা এবি ডিভিলিয়ার্স (AB de Villiers)-এর মতো নিখুঁত টেকনিক না থাকলেও সফল হওয়া সম্ভব।’ তাঁর মতে, ‘ক্রিকেটে নিজের শক্তি বুঝে খেলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
ক্রুণাল পাণ্ড্য (Krunal Pandya) এবং ভুবনেশ্বর কুমার (Bhuvneshwar Kumar)-এর পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে কোহলি বলেন, ‘ম্যাচের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে মাঠের বাইরে থেকেও একটা চাপ কাজ করে। তবে সেই সময়ই ভেতরে একটা আলাদা শক্তি তৈরি হয়।’ তাঁর কথায়, এই ধরনের মুহূর্ত এখনও তাঁকে ক্রিকেটের প্রতি টান বাড়িয়ে দেয়। অবসরের প্রসঙ্গ উঠতেই কোহলি জানান, তিনি এখনও নিজের সেরাটা দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘যদি মনে হয় আমি দলের জন্য প্রয়োজনীয় অবদান রাখতে পারছি না, তা হলে নিজে থেকেই সরে দাঁড়াব।’ তবে আপাতত সেই পরিস্থিতি আসেনি বলেই তাঁর ইঙ্গিত। প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও যথেষ্ট কঠোর। ৩৭ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিত অনুশীলন, শরীরচর্চা এবং খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় প্রস্তুত থাকতে চাই। কোনও সিরিজ়ের আগে হঠাৎ করে পরিশ্রম বাড়াই না, বরং সারা বছর একই ছন্দে থাকি।’ তাঁর মতে, এই ধারাবাহিক প্রস্তুতিই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম ভিত্তি।
২০২৭ সালের বিশ্বকাপ (World Cup 2027) নিয়েও নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার করেছেন কোহলি। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই বিশ্বকাপ খেলতে চাই। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার অনুভূতি আলাদা।’ তবে তিনি এটাও জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে দলের প্রয়োজনের উপর। দলে নিজের অবস্থান নিয়ে কোহলি সৎ মতামত চান। তিনি বলেন, ‘যদি মনে হয় আমি যথেষ্ট ভালো নই, তা হলে সরাসরি বলে দেওয়া হোক। কিন্তু যদি মনে হয় আমি এখনও দলে অবদান রাখতে পারি, তা হলে অযথা পরিবর্তন করা উচিত নয়।’ তাঁর মতে, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দলের সাফল্যের জন্য জরুরি। আইপিএল জয়ের পরেও কোহলির এই সংযত এবং বাস্তববাদী মনোভাবই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ট্রফির বাইরেও ক্রিকেটকে ভালবাসা, নিজের সেরাটা দেওয়ার ইচ্ছা এবং দলের প্রতি দায়বদ্ধতা, এই তিনটি দিক তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma | নতুন রূপে রোহিত শর্মা : ফিটনেসে বদলে গেল হিটম্যান, ক্রিকেট দুনিয়া মুগ্ধ




