সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : কেরল হাই কোর্ট (Kerala High Court) মুসলিম বিবাহ আইনের (Muslim Personal Law) প্রয়োগ নিয়ে এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, কোনও মুসলিম পুরুষ যদি তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে নথিভুক্ত করতে চান, তবে তাঁর প্রথম স্ত্রীর সম্মতি থাকা আবশ্যক। প্রথম পক্ষের স্ত্রী জীবিত থাকলে তিনি “নীরব দর্শক” হয়ে থাকতে পারেন না; তাঁর মতামতেরও আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। উল্লেখ্য, এই মামলাটি দাখিল করেছিলেন কেরলের বাসিন্দা, মহম্মদ শরিফ (Mohammed Sharif)। তিনি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আবেদন করেন যে, তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং চান সেই বিবাহটি সরকারি নথিভুক্তিকরণে স্বীকৃতি পাক। কিন্তু স্থানীয় রেজিস্ট্রার তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করেন। এই পরিস্থিতিতেই শরিফ আদালতের যান।
উল্লেখ্য, শুনানির সময় কেরল হাই কোর্টের বেঞ্চ জানায়, মুসলিম ব্যক্তিগত আইন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একাধিক বিবাহের অনুমতি দিলেও তা নির্বিচারে প্রয়োগ করা যাবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, “যদি কোনও মুসলিম পুরুষ তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ নথিভুক্ত করতে চান, তবে তাঁকে প্রথম স্ত্রীর মতামত গ্রহণ করতেই হবে। প্রথম স্ত্রী আপত্তি জানালে রেজিস্ট্রার কোনওভাবেই সেই বিয়ে নথিভুক্ত করতে পারবেন না।” বিচারপতি আরও স্পষ্ট করেন, “মুসলিম ব্যক্তিগত আইন দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতা স্বীকার করে, কিন্তু তা সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও সংবেদনশীল বিষয়। প্রথম স্ত্রীর অধিকার ও সম্মান রক্ষার দায় রাজ্য প্রশাসনেরও রয়েছে।”
আদালত এই মামলাটি শেষ পর্যন্ত খারিজ করে দেয়, কারণ মামলাকারী মহম্মদ শরিফ তাঁর প্রথম স্ত্রী’কে মামলার পক্ষ করেননি। ফলে তাঁর আবেদন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। তবে রায়ের মধ্যে দিয়ে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বিচারপতির মন্তব্য, “দ্বিতীয় বিবাহ নথিভুক্ত করানো যাবে না, এমন নয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই প্রথম স্ত্রীর মতামত ও অনুমতি অপরিহার্য।” আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনও মুসলিম পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ নথিভুক্ত করতে চাইলে রেজিস্ট্রারকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রথম স্ত্রীর অবস্থান ও মতামত জানতে হবে। প্রথম পক্ষ যদি দাবি করেন যে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ, তাহলে রেজিস্ট্রার সেই নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখবেন। মামলাটি তখন মুসলিম পার্সোনাল ল’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। এই রায়কে বিশেষজ্ঞরা ভারতীয় পারিবারিক আইন ব্যবস্থার এক “প্রগতিশীল পদক্ষেপ” বলেই মনে করছেন। কেরলের সমাজকর্মী ও নারী অধিকার কর্মী শায়লা রহমান (Shaila Rahman) বলেন, “কেরল হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ মুসলিম নারীদের জন্য এক বড় আশ্বাস। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়েই দ্বিতীয় বিবাহ হয়, যা তাঁদের আত্মমর্যাদার পরিপন্থী।”
আরও পড়ুন : Shyamal Nath joins BJP | SIR শুরু হতেই চমক! আলিপুরদুয়ারে তৃণমূল ছাড়লেন শ্যামল নাথ, ফের যোগ বিজেপিতে
অন্যদিকে, আইনজীবী ও ইসলামিক আইন বিশেষজ্ঞ নাসিরুল হক বলেন, “এই রায় ইসলামিক শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলাম একাধিক বিবাহের অনুমতি দেয়, কিন্তু তা কঠোর শর্তসাপেক্ষ। কোরানে (Quran) বলা হয়েছে, ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় না রাখতে পারলে দ্বিতীয় বিবাহ করা উচিত নয়। আদালত আসলে সেই নৈতিক নীতিকেই আইনগত আকার দিয়েছে।” উল্লেখ্য যে, এই রায়ের পর দেশের বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেরলের মুসলিম মহিলা সংগঠনগুলির মতে, এই নির্দেশ মুসলিম বিবাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনবে এবং নারী নির্যাতন বা প্রতারণার আশঙ্কা অনেকটা কমাবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করেছে যে, মুসলিম পার্সোনাল ল’-এর ব্যাখ্যা শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও লিঙ্গসমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যের আদালতগুলিতেও নজির হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী মেহরিন খাতুন বলেন, “কেরল হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি ভারতের নারী ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক বড় পদক্ষেপ।” প্রসঙ্গত, ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও, পারিবারিক আইনের প্রয়োগে নারী অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এই রায় নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে উঠেছে। কেরল হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ শুধু মুসলিম বিয়ে নয়, বরং বহুবিবাহের প্রশ্নে সামগ্রিকভাবে সামাজিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের পথ খুলে দিল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Modi Pinarayi Vijayan Meeting | কেরালার মুখ্যমন্ত্রীর নয়াদিল্লি মিশন: রাজ্যের আর্থিক সুরক্ষা ও উন্নয়নের গতি বাড়াতে মোদীর হস্তক্ষেপ কামনা, বার্তা : ‘কেন্দ্র-রাজ্য সহযোগিতাই জাতীয় স্বার্থের পথ’




