সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা, কিন্তু অন্তরে যুক্তিবাদের বিশ্বাস। এমনই এক চিত্র দেখা গেল মঙ্গলবার উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রামমোহন লাইব্রেরিতে (Rammohan Library)। সেখানে অনুষ্ঠিত হল কলকাতা জেলার প্রথম ‘নাস্তিক সম্মেলন’ (Atheist Conference)। সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও মানবতাবাদ নিয়ে এক অনন্য আলোচনা মঞ্চে একত্র হলেন কয়েকশো মানুষ- কেউ নাস্তিক, কেউ সংশয়বাদী, কেউ আবার ধর্মের কাঠামোয় আবদ্ধ না থেকেও সংস্কৃতির পরিচয় বয়ে চলেছেন।
সম্মেলনে হাজির ছিলেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রবন্ধকার আশিস লাহিড়ী (Ashis Lahiri)। তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্ট ধ্বনিত হয়েছিল ধর্মানুভূতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের পার্থক্যের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, “ধর্মানুভূতি মানুষের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, যা মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধতা প্রায়শই সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে।” তাঁর মতে, “রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের ধর্মচর্চার জন্য অনুদান দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের পথে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।” এই সম্মেলনে আশিসবাবু উল্লেখ করেন সাম্প্রতিক মহিলাদের ক্রিকেট বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ম্যাচে জেমাইমা রদ্রিগেজের (Jemimah Rodrigues) আবেগমাখা কান্নার কথাও। তিনি বলেন, “অনেকে খেলায় নামার আগে যজ্ঞ করেন, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কিন্তু খেলা শেষে রদ্রিগেজের চোখের জলে ছিল মানবিক আবেগ। যজ্ঞের উন্মাদনা নয়, সেই কান্নায় লুকিয়ে ছিল সত্যিকারের অনুভব।”
নাস্তিকতা যে আবেগহীন বা শুষ্ক কোনও মতবাদ নয়, তা যেন প্রমাণিত হলো এদিনের আলোচনাতেই। প্রবীণ বক্তা শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত (Shubhranjan Dasgupta) বক্তৃতায় গ্যালিলিওর (Galileo) প্রসঙ্গ তোলেন। ধর্মযাজকদের হাতে গ্যালিলিওর উপর হওয়া নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ গলায় আবেগে কেঁপে উঠলেন তিনি। তিনি বলেন, “গ্যালিলিও শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুক্তির যোদ্ধা। তাঁর মধ্যে আমরা দেখি সেই সাহস, যা অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেয়।”
একই মঞ্চে আলোচকরা তুলে ধরেন বাংলা ও উর্দু সাহিত্যে নাস্তিকতা ও মানবতাবাদের দীর্ঘ ধারার ইতিহাস। তাঁরা বলেন, “চার্বাক (Charvaka) দর্শন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ভারতীয় সংস্কৃতিতে নাস্তিকতার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত।” এই সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত তৈরি করেন টালিগঞ্জের সূর্যনগরের বাসিন্দা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় (Protima Bandyopadhyay)। সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা পরে তিনি উপস্থিত হন সভায়। তাঁর স্বামী সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (Surajit Bandyopadhyay), যিনি টিসকোর (Tisco) সিনিয়র ফার্মাসিস্ট ছিলেন, ঘোর নাস্তিক। প্রতিমা বলেন, “আমাদের বাড়িতে কোনও পুজো হয় না। আমি নিজেও বিশ্বাস করি না এসব। তবু বাইরে বেরোলে সিঁদুর-পলা পরি, অভ্যাসটা রয়ে গেছে। চেষ্টা করছি, একদিন ছেড়ে দিতে।” তাঁর এই অকপট স্বীকারোক্তি সম্মেলনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
সম্মেলনে ‘নাস্তিকতা এবং পুরুষতন্ত্র’ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন তরুণ বক্তা দেবস্মিতা (Debosmita), যিনি নাস্তিক মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি বলেন, “মেয়েদের শাঁখা-সিঁদুর, বা বোরখা পরতে বাধ্য করার যে সংস্কৃতি, তা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণেরই বহিঃপ্রকাশ। নাস্তিকতা মানে কেবল ঈশ্বরকে অস্বীকার করা নয়, এই সামাজিক শৃঙ্খল থেকেও মুক্তি।” দেবস্মিতা জানান, তিনি ও তাঁর স্বামী মিলে যুক্তিবাদী ও নাস্তিক ভাবনার লেখালিখি প্রকাশের জন্য একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলেছেন। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে চেয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) প্রয়াত ছাত্রী অনামিকা মণ্ডলের (Anamika Mandal) মা মীনাক্ষী মণ্ডল (Minakshi Mandal)। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে না পারলেও, তাঁর বার্তা পড়ে শোনানো হয় সভায়। মেয়ের মৃত্যুর পর থেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বার্তায় লেখা ছিল, “আমার বিশ্বাস, যদি ঈশ্বর থাকতেন, আমার মেয়েকে বাঁচাতেন। তাই এখন আমি শুধু যুক্তিতে বিশ্বাস করি।” উল্লেখ্য, নাস্তিক মঞ্চের (Nastik Mancha) সংগঠকরা জানান, ভারতে যুক্তিবাদী সংগঠন অনেক হলেও তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সমালোচনায় নীরব থাকে। তাঁদের দাবি, “আমরা সেই জায়গায় সরাসরি প্রশ্ন তুলতে চাই। ধর্মীয় উন্মাদনা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী সমাজ গড়ে তুলতে হবে।” অন্যদিকে, এক তরুণ অংশগ্রহণকারী, গায়ে রামধনু পতাকা (Rainbow Flag) জড়িয়ে ছিলেন, হাসতে হাসতে বলেন, “আজ রামমোহন লাইব্রেরি ভরেছে, একদিন স্টেডিয়াম ভরাবো!” তাঁর কথায় উঠে আসে নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস, যে নাস্তিকতা আর নিঃশব্দ দর্শন নয়, এটি এক মানবিক আন্দোলন। সম্মেলন শেষে এক প্রৌঢ় দর্শক বলেন, “আজকের এই নাস্তিক সম্মেলন কেবল ধর্মবিরোধী বক্তব্য নয়, এটি সমাজে যুক্তি, মানবতা ও সহানুভূতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana wedding | বিশ্বজয়ের আনন্দের মধ্যেই নতুন ইনিংস! বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন স্মৃতি মান্ধানা, প্রেমিক পলাশ মুছলের সঙ্গে বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন ‘উইমেন ইন ব্লু’ তারকা




