সম্পাদকীয় 🌱
আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই পুস্তকপ্রেমীদের ভেতর বেশ উত্তেজনা থাকে। চলতি বছরও (আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলা ২০২৪) তার ব্যতিক্রম নয়। মুদ্রিত নতুন বই ও নতুন বইয়ের গন্ধ নেওয়ার জন্য এখনও ভারতবর্ষের তথা বঙ্গের মানুষ প্রতীক্ষা করেন। বইয়ের এই উৎসব লেখক পাঠকদের মিলন ক্ষেত্রেও বটে। তবে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশকে কেন্দ্র করে বইমেলায় যে অন্য মেজাজ চোখে পড়ে সম্প্রতি ক’য়েক বছরে তা সামান্য হলেও ভাটা পড়েছে বৈকি! সাহিত্যের পাঠক বইমেলা’য় লিটল ম্যাগাজিনের সেই মেজাজ আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের ভেতর দিয়েই ফের দেখতে পাবেন তা প্রত্যাশা করা-ই যায়। 🦋
আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলা ২০২৪। সাশ্রয় নিউজ ★ কবিতা স্পেশাল সংখ্যা

সঞ্জয় ভট্টাচার্য
বিবাগী প্রেমিক
বিবাগী ধূসর প্রেমিক আদিগন্ত ব্যথা বুনে যায়,
ব্যথার রঙ গাঢ় মেরুন…
কে তাকে বোঝায়!!
আফজল আলি
ভালোলাগার গানে
ভালোলাগার গানে ওই যে সুর ভেসে আসে ওখানেই যেন, আমার হৃদয়
কাছে থাকলে কী যে ভালো লাগে
যেন ডানা মেলতে মেলতে আমি রক্তের শিরা উপশিরা ছাড়িয়ে
ওই যে দক্ষিণ দিক
দক্ষিণেই সমুদ্র, সহজ ভাষার কবিতা
দার্শনিক সিকোয়েন্সির মাঝে সমর্পণের আহ্বান
একার জন্য কী তীব্র এই অনুসন্ধান
মন মানে না , বারবার খুঁজতে থাকি
দূরত্বের অ্যালকোহলে বসে মাঝে মাঝে সিগারেট ধরাই
কিছুটা ধোঁয়ার পরিকল্পনার মধ্যে ছুঁয়ে আসি তোমায়
কত কী যে বলতে থাকি
শুদ্ধতার কথা, পবিত্রতার কথা
আর সব কিছু ছাপিয়ে অনন্য হয়ে ওঠার গল্প
ভালোথাকার জবাবী ভাষণে কৌশলী তো নয়
স্বপ্ন দেখি ভীষণতর এক হয়ে যাওয়ার অনবদ্য টোটকা কিছু
চিত্তরঞ্জন দেবনাথ
আমি কি লিখছি
জুঁই লিখুন, বড়জোর চাঁপা
কেন লিখবেন?
ওসব যে এখন লেখাই হচ্ছে না দাদার
মানুষ ভুলেই গেছে করবি, মাধবীলতা, জবা, অতসী, শিউলি, টগর
ভুলে গেছে আমসত্ত্ব, হাতম্বল, বড়ইয়ের আচার
বরং মেয়েছেলেরা উদোম পিঠে ট্যাটু লিখছে
উরুতে ত্রিশূল লিখছে, কব্জিতে লিখছে হার্ট শেইপ
এভাবে রাতও সচ্ছিদ্র মন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
কেউ যদি স্বচ্ছল সুখ লিখে দেয় একটুখানি
আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আমি কি লিখছি
আমি বলব একটা সাদামাটা মানুষ লিখছি
যে অভাব খেয়ে শুয়ে আছে বউয়ের উষ্ণ বুকে

অরুণাভ ভৌমিক
তিন টুকরো কবিতা
ক.
ক্রমাগত জায়গা বদল করে
পরিচিত সম্পর্ক
রচিত হয় উপন্যাস
খ.
মিথ্যের মুখোমুখি কত যে ঘটনা
গভীরে তার কেউ হাত রাখে না
শুধু ঠোঁট কেঁপে ওঠে
ভেঙে পড়বার আগে
গ.
সাদা দেওয়াল তো অনন্ত সম্ভাবনা
আদিগন্ত শূন্যের মাঝে
ভোরের আলো ছুঁয়ে গেলে
প্রশান্ত বালিয়াড়ি
আবু আফজাল সালেহ
তোমার ভালোবাসা
তোমার ভালোবাসা ঘৃণার মত গন্ধ
সে-সব গন্ধ এবং তোমার প্রেমের ভয়
আমাকে বশ্যতা করেছে, পঙ্গু করেছে।
তোমার ভালোবাসার কষ্ট
প্রতিটি আন্দোলন ব্যথা নিয়ে আসে।
তোমার ভালোবাসার ব্যাথা
প্রতিটি অনুভূতি ব্যথা নিয়ে আসে।
তোমার ভালোবাসা দুঃখের ফসল
প্রতিটি চিন্তা ব্যথা নিয়ে আসে।
তোমার ভালোবাসা যন্ত্রণা হয়
প্রতিটি স্মৃতিই যন্ত্রণা নিয়ে আসে।
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়
দহন
আগামী বছর শীতে ছুটি পেলে দেখা হবে
জন্ম মৃত্যু সানাই
যেন ভুলে না যাই
হামা দিয়ে শিশু, মোমের শরীর রাত্রিদিন শুধু
শুশ্রষায় ভরা কিছু স্তব্ধ ছায়া আর দীর্ঘশ্বাস
আগামী বছর শীতে প্রতিটি নদীর সঙ্গে
আত্মার মিলন ভ্রূকুটিহীন তোমার মুখের রেখা
কি এক অপ্রকাশিত আগুন
আমার কথা ভেবে দুঃখ কোরোনা যেন
যে হাসি ছিলনা মুখে চোখে তার লক্ষ তারার দহন
মৃত্যু বিচ্ছেদ তর্পণের ভাষা থেকে দূরে
সেই জল যেন ভরা থাকে
স্বাতী বিন্দু অরুন্ধতী যেন বীজ হয়ে বেঁচে থাকে
দুধেভাতে, স্নেহ ভরা চোখে যেমন সন্তানেরা থাকে
খাতুনে জান্নাত
আমার মা
আমার মায়ের মধ্যে প্রচণ্ড সাহস ছিল।
আঙুলগুলোকে সচল করে আমাদের গতিময় করে তুলতেন অনায়াসে
আমরা নকশি ফুল, আমরা ঝাড়বাতি, আমরা হাত-পাখায় বন্ধুর পত্র-লিখন।
ভোরের বাগানে রেণু-ফুল-ঘ্রাণ
ছুটছি, দৌড়াচ্ছি কাজের স্রোত…
মা ভালোবাসতেন বই
গল্পে গল্পে হারাতাম-
রামায়ন, মহাভারত, কসসুল আম্বিয়া
গাজী কালু চম্পাবতী
শরৎ-ফাল্গুনী বিকাল
রাত নিঝঝুম রেডিও নাটক…
মায়ের মধ্যে গুঁড়োগুঁড়ো স্বপ্ন ছিল
শুদ্ধ উচ্চারণে আমার বর্ণমালা
কবিতা গানে মুখরিত প্রাণোচ্ছ্বাস
গ্রাম পেরিয়ে শহরের সিঁড়ি
দেশ পেরিয়ে মহাবিশ্ব;
মা তখন গর্বিত বঙ্গ জননী…
মায়ের মধ্যে আগুনও ছিল।
তাই তো পুড়ছি ভেদ, ক্লেদ, দ্বিধা, শিকল।
সমতার ভিতে জীবন গড়তে
সংগ্রাম চলবেই চলবে…
স্বপন পাল
স্মৃতির আতর
মিলিয়ে যাচ্ছে রোদ, মিহি সিল্কের দোহাই দিয়ে।
কবেকার আতরের শিশি,
বাতাসকে বিলোবার আছে কিছু বুকে? পরিচয়ে যার এ আতর ছিল
প্রথম সঙ্গমের মতো শিশি ও ছিপির মুখে
আরষ্টতা ভয়, চিনতে পারে সে।
গন্ধ পায়, আর কেউ পায় না সে ঘ্রাণ।
সিল্কের আঁচল টেনে রোদ চলে গেলে
বাতাস নিবিড় হবে কথা দিয়ে ফেলে।
সারা সন্ধ্যা জল্পনার ঝোপে ও অন্ধকারে
জোনাকির শেখানো জ্যামিতি
রাতের আশ্বাস দিতে এলে,
প্রায় দিন চাঁদ এসে ভুল ভেঙ্গে দেয়,
প্রায় দিন চাঁদ এসে বলে, রাত বিলিয়ে দেবার।

চন্দ্রিমা দত্ত
মা
মায়ের গন্ধ মেখে আশ্বিন আসে
মা কাছে নেই, অলকানন্দা-তীরে
তবু মাতৃসৌরভ অবিকল মা হয়ে ওঠে
আশ্বিন আকাশ স্বপ্ন বিভ্রমে দুলছে
মেঘেরাও আজ যেন এলোমেলো…
এলোমেলো আমার পৃথিবী-বাস
ঐ দূর নদীপথে কী যেন লিখে চলে যায়
জল-প্রেমিক ধবলডানা রাজহাঁস…
সমস্ত মায়া একত্রিত করে মা
বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে গেলো
কাছ থেকে দূরে
প্রান্তর, নগর থেকে বহুদূর শূন্যে
আমি মায়ের কাছে শিখেছি-
জমাট পাথর কীভাবে অনুটুকরো
করলে একটি নিটোল সুর জেগে ওঠে…
দুঃখকে ধূসর করার মন্ত্র মা জানতো
মা আরও অনেককিছু জানতো…
তাই আশ্বিনে মাতৃবন্দনা মানে
সন্তানকে ঘিরে আমার মায়ের
অবিরল জেগে ওঠা…
দিব্যেন্দু নাথ
‘জম্পুই-মেয়ে’
শরৎ ভেজা এক টুকরো রোদ্দুর
দোপাতা-র উচ্ছ্বাস ভরা মোহনায়
দেও এর বুকে
প্রাণোচ্ছল ঢেউএ
খিলখিল হাসছে
কমলা-মাংসে
ফোলা-ফোলা ঠোঁটে
এক নব-কিশোরী।
জন্মে ছিল!
কোন এক মধু পূর্ণিমায়
জম্পুই-এর ঢালে
ঝর্ণার উঁরু বেয়ে
জলজ মায়ায় গড়িয়ে।
কমলার গন্ধ মেখে, মা ভাসিয়ে ছিল
দোপাতা-র বিলি কাটা স্রোতে
দেও-এর তটে
পিতৃ পরিচয় জেনে
বাবার সোহাগ নিতে…
স্বাতী ইন্দু
শরৎকাল
খই ছড়ানো রাস্তা দিয়ে যাওয়া
বাবা,মা প্রায়ই স্বপ্নে আসে।
কি যে বলা কওয়া হয়,সেসব
থাকে না মনে। কিন্তু মার মুখটি
বাবার হাসিটি মনে থাকে ঠিকই
ঘুমের এপারে। ফ্রয়েড, ইয়ুং আমি
পড়েছি তবুও স্বপ্ন বিশ্লেষণের
চেয়ে ভালো লাগে নির্ভরতার
দুটি মুখ যেন পৃথিবীর বটবৃক্ষ
নীলাভ আকাশ আর রবীন্দ্র সঙ্গীত।
বাবার দেশের গল্প, মায়ের রান্নার
স্বাদ, সেই ওমে ভরা ভাদ্রমাসের
অমাবশ্যা উদযাপন এখনো যেমন
মনে পড়লে মনে হয় তত বড়
হইনি কখনো, আজও শাবক পাখির
মতো কুলায়ে অপেক্ষা রত
অভ্যাসের অন্নজল, স্নেহমায়ার খুদ।
শ্রীমান দাস
শব্দের মায়াজালে
বুকের ভেতর অজানা স্রোত
তলদেশ ফুঁড়ে ওঠে ভয়ের বুদবুদ!
হৃদস্পন্দনে যখন উদ্ধগতি খুউব,
তোমার কবিতাঘরে তখন
আমার নিঃশব্দ পায়চারি।
তুমি মেলে দিলে শব্দের বিছানা।
আমি এলিয়ে দিলাম শরীর…
তুমি জড়িয়ে নিলে বুক পেতে
আমি হারিয়ে গেছি শব্দের মায়াজালে।
তপনকান্তি মুখার্জি
বিভিষিকা
গভীর আঁধারের ঘোর ছিল কাল রাতে।
আকাশে চাঁদ ছিল না, নক্ষত্র ছিল না,
ছিল না ধ্রুবতারা। শুধু আমগাছের ডালে বসে শঙ্খচিলটি স্থির ছিল পাথরের চোখের মতো।
গভীর ঝঞ্ঝার রাত ছিল কাল।
ফুটপাতে সংসার ছিল না, পথে যানবাহন, ছিল না বিদ্যুৎসংযোগ। গাড়িবারান্দার নীচে চলেছিল জায়গাদখলের লড়াই। শুধু হেলদোলহীন হাওড়া ব্রিজ শুয়েছিল কাঁকড়াবিছের মতো মাটি কামড়ে।
গভীর বৃষ্টি হয়েছিল কাল রাতে।
হাইড্রেন ভেসেছিল, খালবিল ভেসেছিল, ভেসেছিল তোতনের মায়ের চোখও। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে সমাধিফলকের মতো শুয়েছিল কালোর পোয়াতি বউ সন্তানের মুখ দেখার আশায়।
অলঙ্করণ : প্রীতি দেব
👉সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী…। ই-মেল : sasrayanews@gmail.com




