সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : মস্কোয় চারদিনের সফরে যাচ্ছে ভারতের একটি বৃহৎ বাণিজ্য প্রতিনিধি দল। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ভারতের আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর রফতানিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তার প্রেক্ষিতেই এই সফরকে দেখা হচ্ছে ভারত সরকারের রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণের কৌশলের অংশ হিসেবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) আগামী মাসে ভারত সফরে আসার কথা। তার আগেই এই প্রতিনিধি দলের সফর দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার বার্তা দিচ্ছে। এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের ২০ জনেরও বেশি রফতানিকারক। ভারতের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ২০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। ভারতের ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস (Federation of Indian Export Organisations – FIEO) এই সফরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংস্থার সভাপতি এস. সি. রালহান (S. C. Ralhan) বলেন, “রাশিয়া সব সময়ই ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার। ইঞ্জিনিয়ারিং ও টুলস সেক্টরে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে।” রালহানের মতে, “রাশিয়ার বাজারে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং রফতানি দ্রুত বাড়ছে এবং এ বছর তা ১.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরের মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করা এবং রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় উৎপাদনের শক্তি তুলে ধরা।”
মার্কিন বাজারে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং রফতানি গত সেপ্টেম্বর মাসে আগের বছরের তুলনায় ৯.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১.৪০ বিলিয়ন ডলারে। এক মাস আগেও যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের মোট রফতানি ছিল ৬.৯ বিলিয়ন ডলার, তা আগস্টে নেমে আসে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারে।এর বিপরীতে রাশিয়ায় ভারতের রফতানি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে (মার্চ পর্যন্ত) ১৪.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে আমদানি, যার বড় অংশই অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য ৪.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩.৮ বিলিয়ন ডলারে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের (Commerce Ministry) পরিসংখ্যানেও এই বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের (Ukraine War) পর পশ্চিমা দেশগুলির সংস্থা রাশিয়ার বাজার ছাড়লে সেখানে ভারতের ব্যবসায়িক সুযোগ বেড়েছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, শিল্প টুলস ও যানবাহন খাতে ভারতের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র দুই বৃহৎ রুশ তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ভারতীয় পরিশোধন সংস্থাগুলি কিছু সময়ের জন্য রুশ তেল কেনা স্থগিত রেখেছে, ফলে আমদানির গতি সাময়িকভাবে শ্লথ হয়েছে।
১১ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত মস্কোয় অনুষ্ঠিতব্য এমআইটিইএক্স টুলস এক্সপো (MITEX Tools Expo) এই সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে। এখানে ভারতীয় সংস্থাগুলি নিজেদের উৎপাদিত ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য প্রদর্শন করবে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস (FIEO) জানিয়েছে, এক্সপোতে ভারতের উৎপাদনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরাই হবে মূল উদ্দেশ্য।ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রক ও মস্কোয় ভারতীয় দূতাবাস যৌথভাবে এই সফরকে সফল করতে বিভিন্ন রুশ ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করছে। দুই দেশের সংস্থাগুলির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, যৌথ উদ্যোগ (Joint Ventures) এবং বিনিয়োগ চুক্তির সুযোগ তৈরি করাই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে।
বানিজ্য কূটনৈতিকরা মনে করছেন, মার্কিন শুল্কবৃদ্ধির ফলে ভারতের রফতানি খাত যে সংকটে পড়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে এই ধরনের বহুপাক্ষিক বাজার সম্প্রসারণ অপরিহার্য। বর্তমানে ভারত মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতেও নতুন রফতানি বাজার খুঁজছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আনন্দ দেশমুখ (Anand Deshmukh) বলেন, “ভারতের জন্য এটি শুধু একটি বাণিজ্য সফর নয়, এটি ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেরও দিক নির্দেশক। মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে দিল্লি পশ্চিমা শুল্কচাপের জবাব দিতে চাইছে।” আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য আগামী দিনে আরও প্রসারিত হবে, বিশেষ করে তেল, প্রতিরক্ষা, ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে তৈরি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Global Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়ায় রাশিয়া নতুন অংশীদার খুঁজছে, আর ভারত সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে চাইছে।তবে, মস্কোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বাণিজ্য সফর তাই শুধু একটি ব্যবসায়িক যাত্রাই নয়, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতিতে ভারতের উপস্থিতির এক জোরালো বার্তা।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন :




