সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৭ নভেম্বর ২০২৫: রাজনীতির ময়দানে ফের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে মুর্শিদাবাদে। তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আসন্ন ২০ ডিসেম্বর তিনি নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করবেন। শুধু তাই নয়, এই দল নিয়ে তিনি বামফ্রন্ট, আইএসএফ (ISF) এবং কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের কথাও ভাবছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আমি একা লড়ব না, লড়ব সবার সঙ্গে। বামেরা, আইএসএফ, কংগ্রেস সবাই মিলে একসঙ্গে মাঠে নামব।”
হুমায়ুনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, তৃণমূলের ভেতরের অসন্তোষ থেকেই কি এই নতুন রাজনৈতিক দৌড়? নাকি পুরনো ক্ষোভের জেরে ‘প্রতিবাদী’ হুমায়ুনের নতুন অস্ত্র রাজনীতি বদলের? হুমায়ুন কবীর বহুদিন ধরেই দলের নীতি ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “দলের মধ্যে দুর্নীতি, তোলাবাজি, অনিয়ম সবই চলছে, কিন্তু কেউ কথা বললে শাস্তি পায়। আমি অনেকদিন ধরেই এসব সহ্য করছি, আর পারছি না।” ভরতপুরের বিধায়কের কথায়, “আমাকে দল থেকে বারবার শৃঙ্খলা ভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণের স্বার্থে কথা বলার জন্য যদি আমাকে শাস্তি দেওয়া হয়, আমি তাতে ভয় পাই না। ২০ ডিসেম্বর আমি আমার দলের ঘোষণা করব। আমি নিজেই হব দলের চেয়ারম্যান।”
তিনি আরও জানান, নতুন দল গঠন হলে মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদীয়া, উত্তর দিনাজপুর ও উত্তর ২৪ পরগনার কয়েকটি কেন্দ্রে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, “আমরা সেইসব জায়গায় প্রার্থী দেব যেখানে মানুষ বিকল্প খুঁজছে।” প্রসঙ্গত, এটি প্রথম নয়। ২০১৬ সালেও তিনি ‘প্রতিবাদী’ হয়ে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়ে জয়ী হয়েছিলেন। এবারও অনেকেই মনে করছেন, হুমায়ুনের এই নতুন দলের জন্ম রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করবে।
দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ নিয়েও এদিন ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিধায়ক। সম্প্রতি ক্যামাক স্ট্রিটে হওয়া বৈঠকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওখানে তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়েছিল। আমাকে নিয়েও কথা হয়েছে। কিন্তু সেই বৈঠকের তথ্য বিকৃত করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন নীলিমেশ (Nilimesh Biswas)।” উল্লেখ্য, নীলিমেশ বিশ্বাস তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন INTTUC -এর বহরমপুর জেলার সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, হুমকি-হুঁশিয়ারি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন হুমায়ুন। তাঁর দাবি, “INTTUC- এর সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Ritabrata Banerjee) মাসে মাসে ‘তোলা’ পাঠান নীলিমেশ। এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমি বারবার প্রতিবাদ করেছি।” এছাড়াও, হুমায়ুন বলেন, “১১ই অগস্টের অভ্যন্তরীণ বৈঠকের পর নীলিমেশ নানা রকম বিকৃত তথ্য ছড়িয়েছে। আমি বহুবার অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। তাই আর নীরব থাকা সম্ভব নয়।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হুমায়ুন কবীরের এই পদক্ষেপ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বিদ্রোহ নয়, তা মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। কারণ, জেলার মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে হুমায়ুনের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। আইএসএফ ও কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য জোট রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। হুমায়ুন আরও জানান, ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের (Babri Masjid) শিলান্যাস অনুষ্ঠানের পরই নতুন দল গঠনের কাজ শুরু হবে। “এই দিনটা আমার কাছে প্রতীকী। কারণ, এই দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা আবারও তুলে ধরতে চাই। আমার দল হবে সাধারণ মানুষের দল, সংখ্যালঘুদের, শ্রমজীবীদের এবং কৃষকদের কণ্ঠস্বর।” রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হুমায়ুনের এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে রাজ্যে তৃণমূল-বিরোধী জোট আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফের জোট যদি তাঁকে গ্রহণ করে, তবে এই নতুন সমীকরণ রাজ্যের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে তৃণমূলের ভোটে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ মনে করছেন, “হুমায়ুন কবীরের রাজনীতি লোকদেখানো,” আবার কেউ কেউ বলছেন, “তিনি যে ক্ষোভের কথা বলছেন, তা অস্বীকার করা যায় না।” এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়, “হুমায়ুনের নতুন দল হয়ত শুরুতে ছোট পরিসরে থাকবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি তৃণমূলের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তিনি সংগঠক হিসেবেও দক্ষ এবং জনপ্রিয়।” তবে, ডিসেম্বরের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন মুর্শিদাবাদ। সবাই তাকিয়ে ২০ ডিসেম্বরের দিকে, যখন হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যে আনবেন তাঁর নতুন রাজনৈতিক দল এবং রাজ্যের রাজনীতিতে খুলে যাবে এক নতুন অধ্যায়।
ছবি : সংগৃহীত




