সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : রেজিনগর উপনির্বাচনের (Rejinagar Bypoll 2026) আগে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (Aam Janata Unnayan Party) প্রধান হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। রাজ্য বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ভোট মিটে গেলে দিল্লি যাওয়ার কথা জানিয়েছেন নওদার বিধায়ক। সেখানে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করে রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে দাবি তাঁর। একই সঙ্গে তামিলনাড়ুর অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয় থলপতি (Vijay Thalapathy) –এর দল তামিলাগা ভেট্রি কাজ়াগম বা টিভিকে (Tamilaga Vettri Kazhagam) -এর সঙ্গেও যোগাযোগের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। ফলে ৬ অক্টোবরের রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে হুমায়ুনের এই বক্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রটি হুমায়ুন কবীরের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হয়ে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। পাশাপাশি নওদা কেন্দ্র থেকেও নির্বাচিত হন তিনি। পরে নওদা আসনটি রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেওয়ায় এই কেন্দ্রে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। ৬ অক্টোবর রেজিনগরে ভোট এবং ৯ অক্টোবর গণনা হওয়ার কথা। এই উপনির্বাচনে হুমায়ুনের ছেলে গোলাম নবি আজাদ (Golam Nabi Azad) আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী হয়েছেন। সেপ্টেম্বরেই তিনি দলের হয়ে মনোনয়ন জমা দেন। উপনির্বাচনের আগে হুমায়ুনের সঙ্গে প্রশাসনের সংঘাতও প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, দলের নেতা-কর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে ও প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কয়েক জন কর্মীকে গ্রেফতার করার ঘটনাকেও তিনি রাজনৈতিক ভাবে দেখছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছেও যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর তোলা অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা বিজেপির পক্ষ থেকে একই বক্তব্য মেনে নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ুন নিজেই রেজিনগরের প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছিলেন ও পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন।
এবার সেই অভিযোগের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিল্লিতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন হুমায়ুন। তাঁর বক্তব্য, ভোটের পর দিল্লি গিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন। রাজ্য বিজেপির ভূমিকা নিয়েই সেখানে অভিযোগ জানাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রেজিনগর উপনির্বাচনে বিজেপি জয় পাওয়ার লক্ষ্যে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের কাছে তিনি বিষয়টি তুলে ধরতে চান। হুমায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর দলের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে যে ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় স্তরে আলোচনা করতে চান। তাঁর কথায়, ‘আমার দলের কর্মী-সমর্থকদের উপর অন্যায় অত্যাচার চালানো হচ্ছে। বিনা কারণে এই হেনস্থা এবং পুলিশি গ্রেফতারির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে।’ সেই অভিযোগের বিরুদ্ধেই দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত বলে তিনি জানিয়েছেন।
বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। হুমায়ুন অবশ্য নিজের দলের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার কথা বলেছেন। অর্থাৎ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে চাইলেও দলের রাজনৈতিক পরিচয় বা স্বাধীন অবস্থান পরিবর্তনের কথা তিনি বলেননি। তাঁর দাবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি তামিলনাড়ুর রাজনীতির সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন হুমায়ুন। বিজয় থলপতির দল তামিলাগা ভেট্রি কাজ়াগমের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তোলার ইচ্ছার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা অভিনেতা বিজয়ের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান। অন্যদিকে, বিজয়ের রাজনৈতিক দল টিভিকে সাম্প্রতিক সময়ে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও ওই দলের নামে সংগঠন গড়ে তোলার কিছু তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে ওই ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে টিভিকে-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমোদনের যোগ নেই বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে হুমায়ুনের সঙ্গে টিভিকে-এর যোগাযোগের বিষয়টি এখনও রাজনৈতিক উদ্যোগের পর্যায়েই রয়েছে।
হুমায়ুনের বক্তব্যে উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরির ভাবনাও। তাঁর দাবি, মাত্র কয়েক মাস আগে তৈরি হওয়া নিজের দলকে সামনে রেখে বিজেপির নীতির বিরোধিতা করতে চান তিনি। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নের অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম বিষয় হিসেবে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকেও আক্রমণ করে দলটিকে ‘ছন্নছাড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন। রেজিনগর উপনির্বাচনে হুমায়ুনের ছেলে গোলাম নবি আজাদ প্রার্থী হওয়ায় তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক ভূমিকাও এ বার নির্বাচনী লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে। হুমায়ুন নিজে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেও দলীয় কর্মসূচী ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য রাখছেন। তাঁর প্রচারের ধরন বদলালেও দলের প্রার্থীর হয়ে রাজনৈতিক লড়াই থেকে তিনি পুরোপুরি সরে যাননি। উল্লেখ্য, রেজিনগর উপনির্বাচনকে ঘিরে বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি সহ একাধিক রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে সৈয়দ আসাদ আলি (Syed Asad Ali) ও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি (Mohammad Abdullahil Kafi)-এর নাম সামনে এসেছে। ফলে হুমায়ুনের দলের প্রার্থীর সামনে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে হুমায়ুনের দিল্লি যাওয়ার ঘোষণা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। রাজ্য রাজনীতিতে সাধারণত কোনও আঞ্চলিক দলের নেতার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নানা জল্পনার জন্ম দেয়। তবে হুমায়ুনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর দিল্লি সফরের উদ্দেশ্য বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করা নয়, রাজ্য বিজেপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা। ফলে এই সফর শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক ফল তৈরি করবে, তা এখনও নির্ধারিত নয়। অন্য দিকে, বিজয়ের টিভিকে-র সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগও নজরে এসেছে। দক্ষিণ ভারতের একটি নতুন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটি আঞ্চলিক দলের সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলে তার রাজনৈতিক পরিসর কতটা বাড়বে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত দুই দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা হয়নি। ফলে আপাতত বিষয়টি হুমায়ুনের রাজনৈতিক আগ্রহ ও যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগ হিসেবেই রয়েছে।
উল্লেখ্য, হুমায়ুনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান দেখলে তাঁর সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এক দিকে নিজের দলকে ধরে রেখে রেজিনগর উপনির্বাচনে ছেলের প্রার্থীপদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্য দিকে রাজ্য প্রশাসন ও বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ রাজনৈতিক ভাবে তুলে ধরা, দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে সক্রিয় থাকতে হচ্ছে। তার উপর দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তামিলনাড়ুর টিভিকে-র সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। রেজিনগরের ভোট ৬ অক্টোবর। তার আগে প্রচারের শেষ পর্বে হুমায়ুনের বক্তব্য আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। ভোটের ফল ৯ অক্টোবর প্রকাশিত হবে। তার পরেই দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিজয় থলপতির সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন। ফলে রেজিনগরের উপনির্বাচনের ফলের পর হুমায়ুনের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হয়, তা নিয়েই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubman Gill 223 Rohit Sharma century | India ODI series win : শুভমন গিলের ২২৩-এ লেখা হল নতুন রেকর্ড, ৪০৫ রান তাড়া করে গুয়াহাটিতে ভারতের রেকর্ড জয়



