সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হুগলি: হুগলির মগরা অঞ্চলে ফের মাথাচাড়া দিল বড়সড় আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ। ‘তাবাসুম ফান্ড’ নামে একটি বেসরকারি সঞ্চয় প্রকল্পের আড়ালে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে গা-ঢাকা দিয়েছে অভিযুক্ত সাবির আনসারি (Sabir Ansari)। ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কিস্তির লোভ দেখিয়ে যে সঞ্চয় প্রকল্পে টাকা রেখেছিলেন, সেই ফান্ডই মুহূর্তে ধসে পড়েছে। হঠাৎ অভিযুক্তের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় আতঙ্কে ভেঙে পড়েছেন অসংখ্য পরিবার। মগরা থানা ও স্থানীয় ফাঁড়ির সামনে সোমবার সকাল থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে। চোখে জল, হাতে নথিপত্র নিয়ে প্রতারিত মানুষ একের পর এক হাজির হচ্ছিলেন অভিযোগ জানাতে। অনেকেই বলছেন, “আমরা শেষ ভরসা হিসেবে যা ছিল, সবটাই সেখানে রেখেছিলাম। এখন জানি না কী হবে।” এক মহিলা অভিযোগকারীর কথায়, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসার খরচের জন্য জমিয়ে রাখা সমস্ত অর্থই তিনি সাবিরের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বাঁশবেড়িয়া বোড়োপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাবির আনসারি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি বেসরকারি সঞ্চয় প্রকল্প পরিচালনা করতেন। নিয়মিত ছোট ও বড় অঙ্কের কিস্তি তুলতেন। অপরদিকে লোকজনকে বুঝিয়ে বলতেন, নির্দিষ্ট সময়ে লাভসহ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এমনকি অনেক সময় তিনি আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের সম্পর্ক ব্যবহার করতেন বিনিয়োগ টানতে। এক প্রতিবাদী বাসিন্দা জানান, “সাবির (Sabir Ansari) খুব চতুরভাবে বিশ্বাস অর্জন করেছিল। কোথায় টাকা রাখছে, কিভাবে ফেরত দেবে- এসব নিয়ে কখনও স্পষ্ট কিছু বলত না। তবুও বিশ্বাস করেছি, আর সেই বিশ্বাসের ফল আজ আমরা দেখছি।”
অভিযোগ, কয়েক মাস আগে এই একই ব্যক্তি হঠাৎ এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। পরে আবার চুপিচুপি ফিরে এসে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন যে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু গত সপ্তাহে আবারও হঠাৎ উধাও সাবির। প্রতারিত মানুষের দাবি, সোমবার একটি বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। বহু মানুষ সেই বৈঠকের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু বৈঠকের আগের রাতেই এলাকা ছেড়ে উধাও হয়ে যায় অভিযুক্ত। একজন বয়স্ক অভিযোগকারী বলেন, “আমরা ভোরবেলায় গেলাম, দেখি বাড়ি তালা দেওয়া। কেউ কিছু জানে না। মোবাইলও বন্ধ। তাহলে কি আমাদের সব টাকা শেষ?” এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনতা মগরা থানায় অভিযোগ জানায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। হুগলি জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ”ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তকে খুঁজে বের করতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।”
পুলিশ সূত্রে খবর, সাবির আনসারি কোথায় পালিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার মোবাইল ফোন শেষবার কোন টাওয়ারে ধরা পড়েছিল, কার সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল—সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকায় পোস্টার লাগিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চিটফান্ড বা অবৈধ সঞ্চয় প্রকল্পের ঘটনাগুলি দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যে দুশ্চিন্তার কারণ। সারদা, রোজভ্যালির মতো কুখ্যাত কেলেঙ্কারির পরও ছোট পরিসরের এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ হয়নি। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “যেখানে মানুষ ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বদলে এমন ব্যক্তিগত ফান্ডে টাকা রাখেন, সেখানে নিয়ন্ত্রণ ভীষণভাবে দুর্বল। ফলে প্রতারণার ঝুঁকি থেকেই যায়।”
এলাকাবাসীর দাবি, সাবির আনসারি বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিল, ফলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কেউ থামায়নি। তবে এই দাবি নিয়ে পুলিশ এখনও কিছু বলেনি।
বর্তমানে শতাধিক পরিবার এই প্রতারণার শিকার। কারও মেয়ের বিয়ের খরচ, কারও চিকিৎসার টাকা, কারও অবসরের সঞ্চয়, সবই গিয়েছে এক ধাক্কায়। ক্ষতিগ্রস্তদের আশা, পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে টাকা উদ্ধার করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। অভিযুক্তকে দ্রুত আটক করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : CV Anand Bose : “রাজ্যের পাওনা বকেয়া নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে” : রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস




