সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস। শুধু বিশ্বজয় নয়, লিঙ্গভেদহীন এক নতুন দিগন্তের সূচনা করলেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তাঁর এক ছবিই এখন গোটা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই ছবিতে ট্রফি আঁকড়ে ঘুমিয়ে থাকা এক নারী, যিনি একবারে ভেঙে দিয়েছেন “জেন্টলম্যান’স গেম” নামে পরিচিত ক্রিকেটের পুরনো ছক। তাঁর টি-শার্টে লেখা, “Cricket is Everyone’s Game” হরমনের এই বার্তা যেন কোটি ভারতীয় নারীর কণ্ঠস্বর, “ক্রিকেট শুধু পুরুষদের নয়, সবার খেলা।” বিশ্বজয়ের আনন্দে যখন গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখনই এই ছবির ক্যাপশনে হরমন লেখেন, “কিছু স্বপ্ন কোটি কোটি মানুষের জন্য। এই কারণেই ক্রিকেট সবার খেলা।” কয়েকটি শব্দ, কিন্তু তার অভিঘাত গভীর, নারী ক্রিকেটের সম্মান, সমান সুযোগ, আর সেই বহুকাল ধরে চলে আসা বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ।
ক্রিকেট যে শুধুই পুরুষদের খেলা নয়, তা নারীরাও বিশ্বমঞ্চে কতটা উজ্জ্বল হতে পারে, তা হরমনদের জয়ে ফের একবার প্রমাণিত। এই দলটি যেমন দক্ষতার দিক থেকে পুরুষদের সমকক্ষ, তেমনই মানসিক দৃঢ়তায়ও পিছিয়ে নেই। বিশ্বকাপ ফাইনালে তাদের প্রতিটি মুহূর্তে ফুটে উঠেছে আত্মবিশ্বাস, সাহস, আর সেই অবিচল লড়াইয়ের মনোভাব। হরমনের নেতৃত্বে ভারতীয় দল যে এক নতুন চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছে, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে এখন স্পষ্ট। দেশের মেয়ে ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে অনাদরে থেকেও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, এবার তাঁদের হাতেই ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় লেখা হল।
হরমনদের এই জয় কেবল একটি ট্রফি নয়, এটি সমাজে নারীর অবস্থান বদলের প্রতীক। কারণ এই দলের অনেকেই এমন পরিবার থেকে এসেছেন, যেখানে মেয়েদের খেলা মানেই সময় নষ্ট। অথচ আজ সেই মেয়েরাই দেশের গর্ব। শেফালি বর্মা (Shafali Verma) একসময় ছেলেদের মতো চুল কেটে, দাদাদের সঙ্গে মাঠে নামতেন, যাতে কেউ বুঝতে না পারে তিনি মেয়ে। আর আজ, সেই শেফালিই ফাইনালের নায়িকা, ৭৮ বলে ৮৭ রানের দুরন্ত ইনিংসের সঙ্গে বল হাতে নিয়েছেন ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। নিজের ছোটবেলার কথা একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন হরমনও। কোমরে ওড়না বেঁধে স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন তিনি। কারণ, গ্রামের মানুষ ভাবতেন মেয়েদের ক্রিকেট খেলা মানে সমাজের লজ্জা। কিন্তু আজ সেই একই হরমন হয়ে উঠেছেন লাখো কন্যার রোল মডেল। তাঁর পোস্টার আজ প্রতিটি ছোট মেয়ের ঘরে ঝুলছে, ‘হ্যারি দিদি**’ হয়ে তিনি অনুপ্রেরণার অন্য নাম।
একসময় যে ভারত ২০০৫ ও ২০১৭ দু’বারই বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে হেরে গিয়েছিল, এবার সেই ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে হরমনের দল। ২০১৭ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারলেও সেই ম্যাচে হরমনের ১৭১ রানের ঝড়ো ইনিংস আজও স্মরণীয়। আট বছর পর সেই স্বপ্নপূরণ, এবার ট্রফি হাতে উঠেছে তাঁরই নেতৃত্বে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জয় শুধু ক্রিকেটের ইতিহাসে নয়, বরং ভারতের সমাজবিজ্ঞানে এক বিপ্লবের সূচনা। “ক্রিকেট সবার খেলা” এই এক লাইন যেন বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সামাজিক বিভাজনকে এক মুহূর্তে মুছে দিল। আজ থেকে কোনও মেয়েকে ক্রিকেট খেলতে চাইলে কেউ ‘ছেলেদের খেলা’ বলে বাধা দিতে পারবে না। কারণ হরমনদের জয় প্রমাণ করেছে, প্রতিভার কোনও লিঙ্গ হয় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বার্তা ভাইরাল হওয়ার পর অসংখ্য তারকা ও প্রাক্তন ক্রিকেটার হরমনের প্রশংসায় মুখর। কেউ লিখেছেন, “এই জয় ভারতের মেয়েদের নয়, গোটা মানবজাতির।” কেউ আবার বলেছেন, “আজ থেকে ক্রিকেট আর জেন্টলম্যান’স গেম নয়, ইজ এভরিওয়ান’স গেম।” এই জয় সেইসব মানুষকেও ধন্যবাদ জানায়, যারা নিঃশব্দে পেছনে থেকেও লড়েছেন, ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami), মিতালি রাজ (Mithali Raj) -এর মতো কিংবদন্তিরা। তাঁদের ঘাম, চোখের জল, আর অনমনীয় জেদেই তৈরি হয়েছে আজকের এই টিম ইন্ডিয়া। উল্লেখ্য, হরমনের ছবিটা যেন স্তম্ভ হয়ে থাকে, ট্রফি আঁকড়ে ঘুমন্ত এক নারী, যার চোখে আছে কোটি নারীর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন এখন সত্যি, কারণ আজ ভারত শুধু ক্রিকেটে নয়, লিঙ্গবৈষম্যরেখা ভেঙেও বিশ্বজয় করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana wedding | বিশ্বজয়ের আনন্দের মধ্যেই নতুন ইনিংস! বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন স্মৃতি মান্ধানা, প্রেমিক পলাশ মুছলের সঙ্গে বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন ‘উইমেন ইন ব্লু’ তারকা



