সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : ভারতের আদি সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করলে তেজস্বী শব্দের স্রোত বয়ে যায় ‘গুরু’। এই একটি শব্দে লুকিয়ে থাকে উপাসনা, শিক্ষা, দীক্ষা, শিষ্যত্ব, আত্মসমর্পণ ও জ্ঞানের অন্তহীন অন্বেষণ। ‘গুরুপূর্ণিমা’ নামের এই পবিত্র তিথি সেই সহস্র বছরের ভারতীয় ঐতিহ্যের বর্ণময় উদযাপন। সেখানে মানুষ শিক্ষককে ঈশ্বরের সমান আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
শিবপুরাণ (Shiv Puran) অনুসারে, প্রথম গুরু ছিলেন স্বয়ং মহাদেব (Shiva)। শিবের কাছে জ্ঞান গ্রহণ করেছিলেন ঋষি সাপ্তর্ষিরা। শিবকে ‘আদি গুরু’ বলা হয়। শিবপুরাণে বর্ণিত আছে, ‘শিবই আদিগুরু, কারণ তিনিই প্রথম তন্ত্র ও যোগ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনিই প্রথম মানবজাতিকে আত্মা ও পরমাত্মার যোগের পথ দেখিয়েছেন।’ এটি আসলে ভারতের আদি তত্ত্বের আরাধনা যেখানে গুরু মানে জ্ঞান, দয়া ও মঙ্গলের মূর্ত প্রতীক।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই গুরুপূর্ণিমা উৎসবের সূচনা ঋষি বেদব্যাস (Vyasa) -এর (ব্যাসদেবের) জন্মতিথির সঙ্গে সম্পর্কিত। বেদব্যাসকে বলা হয় মহাভারত রচয়িতা, উপনিষদের সঙ্কলক ও ঋগ্বেদের সংহিতা বিভাজনকারী। বেদব্যাসের অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতেই গুরুপূর্ণিমা পালনের রীতি গড়ে ওঠে। প্রখ্যাত বেদান্ত পণ্ডিত স্বামী চিন্ময়ানন্দ (Swami Chinmayananda) বলেছেন, ‘Without a guru, there is no knowledge. Without knowledge, there is no freedom.’ অর্থাৎ ‘গুরু ছাড়া জ্ঞান নেই, আর জ্ঞান ছাড়া মুক্তি নেই।’ ভারতের আদি গুরু-শিষ্য পরম্পরা আসলে সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ভিত্তি। প্রাচীন গুরুকুল ব্যবস্থা ছিল তার প্রমাণ। সেখানে গুরুর আশ্রমে থেকে শিষ্যরা পড়াশোনা করত, এবং বিনিময়ে গুরুর সেবা ও আশ্রমরক্ষা করত। ‘তৈত্তিরীয় উপনিষদে’ বলা হয়েছে, ‘মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব, আচার্যদেবো ভব।’ অর্থাৎ, মা, বাবা ও আচার্য তিনজনই জীবনের গুরু। ভারতের শাস্ত্রীয় কথকতায় গুরু মানে শুধুই শিক্ষাদাতা নন, তিনি ‘দীক্ষাদাতা’। তিনি শিষ্যের অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করেন। গীতায় (Gita) বলা হয়েছে: ‘তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।’ অর্থাৎ, ‘প্রণিপাত, প্রশ্ন ও সেবার মাধ্যমে জ্ঞানলাভ সম্ভব।’ বিশিষ্ট যোগাচার্য বি কে এস আয়েঙ্গার (B.K.S Iyengar) গুরুপূর্ণিমার মাহাত্ম্য নিয়ে বলেছিলেন, ‘Guru Purnima is not just about thanking your teacher, it is about dissolving your ego before your teacher to receive the nectar of truth.’ তার মতে, এই দিন শিষ্যরা তাদের অহংকে ভেঙে চূর্ণ করে গুরুদেবের চরণে রেখে আসে, যাতে সত্যরস লাভ করতে পারে।
শিবপুরাণ (Shiv Puran) -এ গুরু তত্ত্বকে নিয়ে এক স্থানে বলা হয়েছে, ‘শিবই প্রথম যোগী, প্রথম গায়ক, প্রথম নৃত্যশিল্পী ও প্রথম গুরু। এই কারণেই তাঁকে নটরাজ (Nataraj), আদিগুরু (Adi Guru) ও যোগেশ্বর (Yogeshwara) বলা হয়।’ বিশেষত গুরুপূর্ণিমা তিথিতে শিবের যোগমুদ্রায় ধ্যান করার রীতি প্রচলিত, কারণ শিষ্যরা বিশ্বাস করে, এই ধ্যান তাদের জীবনে আধ্যাত্মিক আলো আনবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন সত্ত্বেও ভারতের মূল শিক্ষা চেতনা এখনও গুরুর ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা, সঙ্গীত বা নৃত্যের গুরু, যোগগুরু, আধ্যাত্মিক সাধক সকলের মধ্যেই গুরু-রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। শিক্ষক দিবস ও গুরুপূর্ণিমা দু’টি আলাদা উদযাপন হলেও ভারতের মানুষ দু’ই দিনেই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। গুরুপূর্ণিমা মূলত আধ্যাত্মিক, শিক্ষক দিবস (Teachers Day) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের উৎসর্গীকৃত। তবুও দু’টির কেন্দ্রে আছে একটাই অনুভূতি, কৃতজ্ঞতা। স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) গুরু সম্পর্কে বলেছেন, “The true teacher is one who can immediately come down to the level of the student, transfer his soul to the student’s soul and see through and understand through his mind. Such a teacher can really teach and none else.’ এই বাণী আজও গুরুপূর্ণিমার দিনে শিক্ষার্থীদের মনে গভীর অনুরণন তোলে।আবার অনেক যোগগুরু মনে করেন, গুরুপূর্ণিমা তিথিতে যোগসাধনা ও ধ্যান বিশেষ ফলপ্রদ। যোগী সদগুরু (Sadhguru) বলেন, “This is the day when the first yogi became the Adi Guru and turned south and sat as a guru to the Saptarishis.” অর্থাৎ শিব এইদিনই যোগী থেকে গুরু রূপে পরিণত হন। তাই গুরুপূর্ণিমা দিনটিকে ‘শিব গুরুপূর্ণিমা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয় অনেক প্রাচীন তন্ত্রগ্রন্থে।
গুরুপূর্ণিমার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি বর্ষাকালের প্রথম পূর্ণিমা। কৃষিভিত্তিক ভারতের গ্রাম-সমাজে এইদিন থেকেই বর্ষার মূল উৎসব শুরু হয়। আদি গ্রন্থগুলিতে ‘অভিষেক’, ‘পাদপূজা’, ‘তাম্বুল’ প্রদান, নতুন বস্ত্র দান ইত্যাদি গুরুপূজার আচারবিধির উল্লেখ আছে।আজকের বিশ্বায়িত সমাজে গুরুপূর্ণিমার তাৎপর্য আরও ব্যাপক। স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে লাইফ কোচ, থেরাপিস্ট, অনলাইন মেন্টর সকলের প্রতিই শ্রদ্ধা জানানো হয়। কারণ জ্ঞানের কোনও সীমা নেই ও গুরু সেই সীমাহীনতার দ্বাররক্ষক। তাই, গুরুর চরণে বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে এই উৎসবের তাৎপর্য প্রকাশ পায় : ‘গুরুব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ। গুরুসাক্ষাত পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।’ এই মন্ত্রেই স্পষ্ট, গুরু অর্থ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সমান। তিনি সৃষ্টির, রক্ষার ও প্রলয়ের ত্রিপুরুষকে একত্রিত করেন নিজের আধ্যাত্মিক সত্তায়। তাই, গুরুপূর্ণিমা হল ভারতীয় সংস্কৃতির সেই মহান দিন, যেখানে মানুষ বিনম্র হয়ে বলেন, ‘হে গুরুদেব, আপনিই আমার আলো।’
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bollywood News : কেন আমিশা অনেক প্রয়োজকদের টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন?



