সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশজুড়ে জ্বালানির দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চর্চা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Fuel) দামের ওঠানামার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে। এই পরিস্থিতিতে পেট্রল ও ডিজ়েলের উপর অন্তঃশুল্কে বড়সড় কাটছাঁটের ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতি লিটার পেট্রল এবং ডিজ়েলে ১০ টাকা করে শুল্ক কমানো হয়েছে। তার পরেই নতুন করে জানানো হয়েছে, এখন থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর জ্বালানির দাম পর্যালোচনা করা হবে। এই ঘোষণার পরই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আগামী দিনে কি আবার দাম বাড়তে পারে? কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ইনডিরেক্ট ট্যাক্সেস অ্যান্ড কাস্টমস (Central Board of Indirect Taxes and Customs)-এর চেয়ারম্যান বিবেক চতুর্বেদী (Vivek Chaturvedi) জানিয়েছেন, ‘অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। পেট্রোল, ডিজেল, এটিএফ -এর দামও বেড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার সব দিক বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অতিরিক্ত শুল্ক এবং সেস আরোপ করা হয়েছে মূলত রফতানি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। ১৫ দিন অন্তর দাম পর্যালোচনা করা হবে।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর থেকেই জ্বালানি বাজারে নতুন করে নড়াচড়া শুরু হয়েছে।
শুল্ক কমানোর ফলে পেট্রোল ও ডিজেলের উপর চাপানো অন্তঃশুল্কের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে পেট্রলের উপর শুল্ক ছিল প্রায় ১৩ টাকা, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ টাকায়। অন্যদিকে ডিজেলের ক্ষেত্রে এই শুল্ক কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে। তবে এখানেই শেষ নয়, পেট্রোল ও ডিজেলের উপর আরও একাধিক সেস এবং শুল্ক প্রযোজ্য রয়েছে, যার ফলে মোট শুল্কের পরিমাণ এখনও উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোলে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১.৯ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ১.৪০ টাকা প্রাথমিক শুল্ক, ৩ টাকা বিশেষ অতিরিক্ত শুল্ক, ২.৫০ টাকা কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস এবং ৫ টাকা সড়ক ও পরিকাঠামো সেস। ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার শুল্ক কমে হয়েছে প্রায় ৭.৮ টাকা, যার মধ্যে ১.৮০ টাকা প্রাথমিক শুল্ক, ৪ টাকা কৃষি পরিকাঠামো সেস এবং ২ টাকা সড়ক ও পরিকাঠামো সেস রয়েছে। এই শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান (Iran)-এ হামলা চালায় ইজ়রায়েল (Israel) এবং আমেরিকা (United States)। এর পরেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস পরিবহণের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে হয়, প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ফলে এই পথ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়।
ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে সরাসরি। দেশ তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির উপর নির্ভর করে। যে অপরিশোধিত তেল ভারত আমদানি করে, তার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। প্রতিদিন প্রায় ২২ লক্ষ থেকে ২৮ লক্ষ ব্যারেল তেল এই পথে ভারতে পৌঁছয়। সেই পথ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও এখনও পর্যন্ত খুচরো বাজারে বড় কোনও বৃদ্ধি দেখা যায়নি। তবে তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলির উপর চাপ বাড়ছে বলে জানা গিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে তেল কিনে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় তাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সেই ক্ষতি কিছুটা সামাল দিতেই কেন্দ্রের এই শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি পাবেন? বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে, অন্তঃশুল্ক কমলেও সরাসরি খুচরো দামে বড়সড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। কারণ, বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক দাম এবং তেল সংস্থাগুলির আর্থিক ভারসাম্য, সবকিছুর উপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত মূল্য। উল্লেখ্য, ১৫ দিন অন্তর দাম পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত জ্বালানি বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলেও অনেকে মনে করছেন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে তার প্রভাবও দ্রুত পড়তে পারে দেশের বাজারে। ফলে আগামী দিনে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম ওঠানামা করতে পারে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে কেন্দ্রের লক্ষ্য জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা এবং বাজারের ভারসাম্য ধরে রাখা। তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল খুচরো দামের পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন কবে এবং কতটা হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের ওপর।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার



