সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হলো পানীয় জলের সঙ্কট। ইতিমধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার পৃথিবীবাসীর জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, মহাসাগরের গভীরে নোনা জলের নিচে লুকিয়ে আছে বিপুল মিষ্টি জলের ভান্ডার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই জলের উৎস কোটি কোটি মানুষের তেষ্টা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার (America) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতলান্তিক মহাসাগরের (Atlantic Ocean) নিচে রয়েছে বিশাল ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলের স্তর। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাসাগরের নোনা জলের নিচে মিষ্টি জল থাকতে পারে, তবে এতদিন তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। সাম্প্রতিক খননকার্যের মাধ্যমে সেই সন্দেহের অবসান হয়েছে।
বহু দেশের সম্মিলিত গবেষণার ফলেই সামনে এসেছে এই তথ্য। আমেরিকা-সহ প্রায় ১২টি দেশ মিলে এই প্রকল্প শুরু করেছিল। সমুদ্রতীর থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রতলে খনন চালানো হয়। এই গবেষণার খরচ হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার (Dollar), যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২২০ কোটি টাকার সমান। সেই খননকার্যের ফলেই মেলে লুকিয়ে থাকা মিষ্টি জলের স্তরের হদিস। গবেষক দল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি (New Jersey) থেকে মেইন (Maine) পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূগর্ভস্থ জলাধার। এই আবিষ্কারের তাৎপর্য অসীম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বে জলসংকট প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের (United Nations) সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী পানীয় জলের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) কেপটাউন (Cape Town) -এর মতো শহরে ইতিমধ্যেই পানীয় জলের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। ফলে সমুদ্রের নীচে মিষ্টি জলের ভান্ডার খুঁজে বের করার জন্য তাদেরও আগ্রহ বেড়েছে।
এক গবেষকের মন্তব্য, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করছিলাম, সমুদ্রের নিচে মিষ্টি জলের স্তর থাকতে পারে। এবার প্রমাণ মিলেছে। যদিও এই জল উত্তোলন করা সহজ নয়, তবু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একদিন আমাদের সেই পথে এগোতে বাধ্য করবে।” তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। সমুদ্রের তলার গভীর থেকে মিষ্টি জল আহরণ সহজ নয়। বিশেষ করে যখন সেখানে নোনা জলের আধিপত্য, তখন মিষ্টি জলকে আলাদা করে তোলা জটিল এবং ব্যয়সাপেক্ষ। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এই ভান্ডার কাজে লাগানো সম্ভব নয়। কিন্তু পানীয় জলের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট বিশ্বকে নতুন সমাধানের পথ ভাবতে বাধ্য করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। খরা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে পানীয় জলের ভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ইতিমধ্যেই ভারত, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য-সহ নানা অঞ্চলে তীব্র জলকষ্ট দেখা দিয়েছে। ফলে সমুদ্রের নীচে মিষ্টি জলের এই ভান্ডার ভবিষ্যতের জন্য হতে পারে গেমচেঞ্জার। একজন আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিশ্লেষক বলেছেন, “এটি নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার জন্য এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। তবে একে টেকসইভাবে ব্যবহার করতে পারা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভুল পদ্ধতিতে উত্তোলন করলে এই ভান্ডারও শেষ হয়ে যাবে। তাই এখনই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।”
বিশ্বজুড়ে গবেষক মহলে এই আবিষ্কারকে ঘিরে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে যেমন নতুন আশা জাগছে, অন্যদিকে রয়েছে প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি। তবে এটা পরিষ্কার যে, ভবিষ্যতে যখন পানীয় জলকে ঘিরে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন এই লুকানো জলাধার মানবজাতিকে বাঁচাতে কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বের জলনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এই আবিষ্কার। হয়তো কয়েক দশক পর, মহাসাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই মিষ্টি জলের ভান্ডারই মানবসভ্যতার বাঁচার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Yadgir Fort travel guide, Karnataka | যাদগির দুর্গের ভ্রমণ, কর্ণাটকে লুকনো অজানা ইতিহাসের




