সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের রাজনীতিতে গোমাতা প্রসঙ্গ নতুন নয়, তবে ফের একবার তা শিরোনামে উঠে এল উপ-মুখ্যমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) -এর সাম্প্রতিক মন্তব্যে। গরুর দুধ, গোমূত্র বা গোবর নিয়ে তাঁর আগের নানা বক্তব্যের মতোই এবারও তিনি দাবি করলেন, গরুকে আদর করলে নাকি মানুষের উচ্চ রক্তচাপ কমতে পারে। মঙ্গলবার উত্তর কলকাতার কাঁকুড়গাছিতে এক চা-চক্রে যোগ দিয়ে এই মন্তব্য করেন রাজ্যের পঞ্চায়েত, প্রাণিসম্পদ ও কৃষি বিপণন দফতরের মন্ত্রী। চা-চক্রে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে দিলীপ বলেন, ‘গরুকে আদর করলে ব্লাড প্রেশার কমে যেতে পারে।’ তাঁর বক্তব্য, ‘গরুর গলকম্বল বা পিঠের কুঁজে হাত বোলালে শরীরের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং রক্তচাপ দ্রুত নামতে সাহায্য করে।’ এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে।
দিলীপ ঘোষ বরাবরই গোমাতা নিয়ে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখেছেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশি গরু মা, আর জার্সি গরু মাসিমা।’ সেই মন্তব্য যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিল, তেমনই গরুর দুধে ‘সোনার উপস্থিতি’ নিয়ে তাঁর দাবি নিয়েও তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। ২০১৯ সালে এক জনসভায় তিনি দাবি করেছিলেন, দেশি গরুর শরীরে এমন এক বিশেষ ‘স্বর্ণনাড়ি’ রয়েছে, যা সূর্যালোক থেকে বিশেষ উপাদান তৈরি করে এবং সেই কারণেই দেশি গরুর দুধে আলাদা গুণ থাকে। মঙ্গলবারের আলোচনায় তিনি শুধু রক্তচাপ নয়, গরুর গোবরের উপকারিতার কথাও তুলে ধরেন। নিজের এক আত্মীয়ের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শরীরের একটি ফোলা জায়গায় গরুর গোবর ব্যবহার করার পর উপশম মিলেছিল।’ তাঁর মতে, গ্রামীণ সমাজে বহুদিন ধরেই গরুকে ঘিরে নানা প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে।
উল্লেখ্য, এই ধরনের দাবি আগেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শোনা গিয়েছে। মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন সাংসদ প্রজ্ঞা সিংহ ঠাকুর (Pragya Singh Thakur) এক সময় বলেছিলেন, ‘গরুর পিঠ থেকে ঘাড়ের দিকে মালিশ করলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে।’ সেই বক্তব্য নিয়েও তখন যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল। দিলীপ ঘোষের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনে দিয়েছে। গোমাতা নিয়ে দিলীপ ঘোষের মন্তব্য বরাবরই রাজনৈতিক তরজা ডেকে আনে। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যেমন অনেকে এগিয়ে আসেন, তেমনই বিরোধীরা কটাক্ষ করতেও পিছপা হন না। অতীতে নিজের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে দিলীপ বলেছিলেন, ‘আমি গরুর কথা বললেই অনেকের অস্বস্তি হয়। গরুর গুরুত্ব যারা বোঝে না, তাদের কাছে এই বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য হবে না।’
করোনার সময়ও তিনি গোমূত্রের উপকারিতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গোমূত্র কার্যকর হতে পারে। সেই সময়েও তাঁর মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড় ওঠে। তবে সেই সব সমালোচনার পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি তিনি। মঙ্গলবারের এই অনুষ্ঠানে দিলীপ ঘোষ আরও জানান, খুব শিগগিরই তিনি দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী এবং গোশালার মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। সেই বৈঠকে গরু পালনের প্রসার, দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। এর আগে থেকেই রাজ্যে পশুপালন ও দুগ্ধশিল্পকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে প্রশাসন।
এই প্রেক্ষাপটে দিলীপের মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সামাজিক স্তরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে ঐতিহ্যগত বিশ্বাস, অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, এই দুইয়ের সংঘাতে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। গরুকে ঘিরে ভারতীয় সমাজে যে আবেগ ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা দাবি, যা নিয়ে মতবিরোধও বাড়ছে। তবে দিলীপ ঘোষ তাঁর বক্তব্যে অনড়। তাঁর দাবি, ‘গরু আমাদের সংস্কৃতির অংশ, তার উপকারিতা নিয়ে আরও বেশি করে গবেষণা হওয়া উচিত।’ যদিও তাঁর এই বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, গোমাতা প্রসঙ্গ আবারও রাজনৈতিক এবং সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : DilipGhosh, AgnimitraPaul, DeputyCM: দিলীপ ঘোষ ও অগ্নিমিত্রা পাল উপ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন | বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ




