সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : তাপমাত্রা নামছে ধীরে ধীরে, শীতের আমেজও বইছে বাতাসে, কিন্তু রাজ্যের মানুষের উদ্বেগের জায়গাটা এখনো একটাই, ডেঙ্গি (Dengue)। আবহাওয়ার পরিবর্তন সত্ত্বেও এই মশাবাহিত রোগের প্রকোপে কোনও ছেদ পড়ছে না। বরং নতুন নতুন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে চিন্তার গতিতে। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২,৫০৩ জনে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন ১০,৮৭১ জন, অর্থাৎ এই অল্প সময়েই আরও ১,৬৩২ জন নতুন রোগী যুক্ত হয়েছেন তালিকায়।
বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ডেঙ্গির প্রকোপ এখন সবচেয়ে বেশি। কলকাতা (Kolkata), উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas), মুর্শিদাবাদ (Murshidabad), হুগলি (Hooghly), হাওড়া (Howrah) এবং মালদহ (Malda) এই ছ’টি জেলাতেই আক্রান্ত প্রায় ৮,৭০০ জন। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ উত্তর ২৪ পরগনায়, মোট ২,৩২৬ জন আক্রান্ত। এরপর মুর্শিদাবাদে আক্রান্তের সংখ্যা ২,৩০৪। তৃতীয় স্থানে হুগলি, যেখানে ১,২৬১ জন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। কলকাতায় আক্রান্ত ১,০৫৭ জন।
এখনও পর্যন্ত কলকাতা পুর এলাকার মধ্যে ডেঙ্গিতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, শিশুটির এনএস-১ (NS1) রিপোর্ট পজিটিভ ছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, উৎসবের মরসুমে মানুষের চলাচল ও জলের জমে থাকা জায়গাগুলির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব থেকেই সংক্রমণ আরও বেড়েছে। শুধু অক্টোবরে এক মাসেই রাজ্যে নতুন করে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৩,২০০ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (Public Health Expert) অনির্বাণ দলুই (Dr. Anirban Dalui) জানিয়েছেন, “এখনই ডেঙ্গির প্রকোপ কমবে, এমনটা ভাবা ভুল। মশার আয়ু প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহ। তাই এখন যে মশাগুলি সক্রিয়, তারা অন্তত আরও তিন সপ্তাহ রোগ ছড়াবে।” তিনি আরও বলেন, “তাপমাত্রা এখন গড়ে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে, কিন্তু যতক্ষণ না তা ২০ ডিগ্রির নিচে নামছে, ততক্ষণ ডেঙ্Aedes aegypti -এর (Aedes aegypti) বংশবৃদ্ধি কমবে না।”
স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, কলকাতার পরে সর্বাধিক সংক্রমণ মালদহে — প্রায় ৯৫৯ জন। এরপর হাওড়ায় ৭৬৬, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (South 24 Parganas) ৬৭৮, পূর্ব বর্ধমানে (East Burdwan) ৫৩৩, নদিয়ায় (Nadia) ৫১৮, বাঁকুড়ায় (Bankura) ৪৩৭ জন আক্রান্ত। এছাড়া পশ্চিম মেদিনীপুর (West Midnapore), পশ্চিম বর্ধমান (West Burdwan), নন্দীগ্রাম (Nandigram), ডায়মন্ড হারবার স্বাস্থ্য জেলা (Diamond Harbour Health District) এবং ঝাড়গ্রাম (Jhargram)–এ আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ থেকে ৪০০-র মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তা জানিয়েছেন, “এখনও প্রতিদিনই নতুন সংক্রমণ ধরা পড়ছে। উৎসবের সময় মানুষ যেভাবে জলের পাত্র খোলা রেখে গেছে, কিংবা মশা প্রতিরোধে অসতর্ক থেকেছে, তার ফল এখন মিলছে। এখনই কঠোর নজরদারি না করলে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা নেই।”
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গি প্রতিরোধে সচেতনতা এখনই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রতিটি পরিবারকে বাড়ির আশেপাশে জলের পাত্র, ফুলদানি বা পুরনো টায়ার পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গির মশা সাধারণত পরিষ্কার জলে জন্মায়, তাই ঘরের ভেতরের ছোট ছোট জলজমার স্থানই হয়ে উঠছে তাদের প্রজনন ক্ষেত্র। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অনির্বাণ দলুই আরও বলেন, “ডেঙ্গি মশা দিনে কামড়ায়। তাই দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা জামা পরা এবং মশা প্রতিরোধক লোশন ব্যবহার করা জরুরি।” তিনি মনে করিয়ে দেন, “ডেঙ্গির কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তাই প্রতিরোধই একমাত্র পথ।”
এদিকে, কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation) জানিয়েছে, শহরে লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ অভিযান চলছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিনের ভিত্তিতে জলের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।তবে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সংক্রমণের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি। স্বাস্থ্য দফতরের মতে, রাজ্যের যে হারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন প্রয়োজন দ্রুত জনসচেতনতা প্রচার। নাগরিকদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকেও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে ডিসেম্বরের আগেও ডেঙ্গির ছায়া পুরোপুরি কাটানো সম্ভব নয়।
এই মুহূর্তে রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের মোট সংখ্যা ১২,৫০৩ জন। চিকিৎসকদের মতে, ঠান্ডা হাওয়া প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যদি তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নামে, তাহলে তবেই সংক্রমণ হ্রাস পেতে শুরু করবে। অতএব, তাপমাত্রা নামলেও স্বস্তির হাওয়া বইছে না। ডেঙ্গির দাপট এখনও তীব্র, আর প্রতিরোধের দায়িত্ব এখন প্রত্যেক নাগরিকের হাতে। কারণ, এই যুদ্ধে জয়ের মূল অস্ত্র সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Kranti Goud World Cup Journey, Indian Women Cricket Team 2025 | গয়না বন্ধক, বাবার সাসপেনশন, সব বাধা জয় করে বিশ্বজয়ী ক্রান্তি গৌড়! ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন অনুপ্রেরণার নাম




