সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের প্রথম সূর্য-পর্যবেক্ষণকারী মহাকাশযান আদিত্য-এল১ (Aditya-L1) এবার পৃথিবীর বিজ্ঞান ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করল। ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (Indian Institute of Astrophysics – IIA) এবং মার্কিন নাসা (NASA) -এর যৌথ প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সূর্যের করোনাল মাস ইজেকশন (Coronal Mass Ejection – CME) -এর স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনাই এখন সূর্য গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, এত কাছ থেকে সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের এত নিকটবর্তী অঞ্চলে কোনো মহাকাশযান আগে কখনও এই ধরনের পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। আদিত্য-এল১-এর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে ভিসিবল এমিশন লাইন করোনাগ্রাফ (Visible Emission Line Coronagraph – VELC) পেলোড, এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণকে সম্ভব করেছে।ড. ভি. মুথুপ্রিয়াল (Dr. V. Muthupriyal), ভিইএলসি (VELC) প্রকল্পের বিজ্ঞানী, জানিয়েছেন, “এই পর্যবেক্ষণ সূর্যের করোনা স্তর থেকে সিএমই (CME)-এর প্রাথমিক উৎপত্তি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দিচ্ছে। এটি সূর্য থেকে নির্গত শক্তির প্রকৃতি, ঘনত্ব ও গতি নির্ধারণে এক নতুন দিশা।” উল্লেখ্য, সূর্য থেকে উদ্ভূত বিশাল প্লাজমার এই বিস্ফোরণ বা সিএমই-কে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা শক্তিশালী সৌরঝড় হিসেবেই দেখা হয়। এবার প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা সূর্যের খুব কাছ থেকেই তার ইলেকট্রন ঘনত্ব, শক্তি, ভর, তাপমাত্রা ও গতি নিরূপণ করতে পেরেছেন, যা ভবিষ্যতের সৌর আবহাওয়া পূর্বাভাসে বড় ভূমিকা রাখবে।
আদিত্য-এল১ মহাকাশযানটি সূর্য-পৃথিবী ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান পয়েন্ট L1 -এ অবস্থান করছে, যেখানে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। ফলে এটি প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এই অবস্থান থেকেই বিজ্ঞানীরা সিএমই-এর জন্ম ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করছেন অভূতপূর্ব নির্ভুলতায়। প্রফেসর আর. রমেশ (Prof. R. Ramesh), আইআইএ-এর সিনিয়র অধ্যাপক এবং ভিইএলসি প্রকল্পের প্রধান গবেষক, বলেন, “VELC-এর মাধ্যমে আমরা সূর্যের সবচেয়ে কাছ থেকে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সিএমই (CME)-এর স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি। এত কাছ থেকে এই ধরনের তথ্য আগে কখনও পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও জানান, এই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিএমই-তে প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন ইলেকট্রন রয়েছে। তুলনামূলকভাবে সূর্যের নন-সিএমই অঞ্চলে এই সংখ্যা ১০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন প্রতি ঘন সেন্টিমিটার।
প্রফেসর রমেশ জানান, এই সিএমই-এর শক্তি প্রায় ৯.৪ × ১০²¹ জুল (Joules), যা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহৃত “লিটল বয় (Little Boy)” ও “ফ্যাট ম্যান (Fat Man)” পরমাণু বোমার শক্তির চেয়েও বহু গুণ বেশি।এই বিশাল সিএমই-এর ভর প্রায় ২৭০ মিলিয়ন টন। যা টাইটানিক ডুবিয়ে দেওয়া বরফখণ্ডের (Iceberg) ভরের প্রায় ১৮০ গুণ। এর প্রাথমিক গতিবেগ ২৬৪ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড, এবং তাপমাত্রা প্রায় ১৮ লাখ কেলভিন (Kelvin)। বিজ্ঞানীদের মতে, এত বিপুল শক্তির এই সিএমই (CME) আমাদের সৌরজগতে কণিকা প্রবাহের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রেও এই ধরনের ঘটনার প্রভাব পড়তে পারে, যার ফলাফল হতে পারে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যাহত হওয়া বা বিদ্যুৎ গ্রিডে সমস্যা সৃষ্টি।
প্রফেসর রমেশ আরও জানান, সূর্য বর্তমানে সানস্পট সাইকেল ২৫ (Sunspot Cycle 25) -এর সর্বাধিক সক্রিয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে আরও বড় ও শক্তিশালী সিএমই (CME) ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। তিনি বলেন, “VELC এখন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর। সূর্যের এই সক্রিয় সময়কালে আমরা আরও বিশাল সিএমই (CME) বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করব এবং সেগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করতে পারব। এই তথ্য ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশন ও পৃথিবীর সৌর প্রভাব বিশ্লেষণে অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে।”
এই পর্যবেক্ষণকে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলা যাবে না; এটি ভারতের মহাকাশ গবেষণায় আরেকটি ঐতিহাসিক সাফল্য। নাসার (NASA) সঙ্গে যৌথ সহযোগিতায় করা এই প্রকল্প প্রমাণ করেছে, ভারত এখন বিশ্বমানের সৌর গবেষণায় এক শক্তিশালী অংশীদার।আদিত্য-এল১ (Aditya-L1) সূর্যের রহস্য উন্মোচনে ভারতীয় বিজ্ঞানের এক গর্বিত অংশ হয়ে উঠেছে। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সূর্যের কার্যকলাপ, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং মহাকাশ আবহাওয়ার উপর তার প্রভাব সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পাওয়া যাবে। যেমনটি প্রফেসর রমেশ বলেছেন, “For the first time, we are watching the Sun’s explosive events as they truly begin — at the very edge of its light.”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Subhangshu Shukla : মহাকাশ থেকে ফিরলেন শুভাংশু ও ওঁর সঙ্গীরা




