সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ লস অ্যাঞ্জেলেস, ৩০ অক্টোবর: হলিউডের এক সময়ের সফল প্রযোজক ডেভিড ব্রায়ান পিয়ার্স (David Brian Pierce) এখন আমৃত্যু জেলের অন্ধকারে। ২০২১ সালের এক ভয়াবহ ঘটনায় দুই তরুণী মডেল ক্রিস্টি জাইলস (Christy Giles) এবং স্থপতি হিলডা ক্যাব্রালেস-আরজোলাকে (Hilda Cabrales-Arzola) মাদক খাইয়ে হত্যার দায়ে তাকে ১৪৬ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি জেলা অ্যাটর্নির অফিস এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ৪২ বছর বয়সী পিয়ার্স শুধু এই দুই নারীর হত্যাই করেননি, ২০০৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আরও সাতজন মহিলাকে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত হন। মামলার প্রধান প্রসিকিউটর সেথ কারম্যাক (Seth Carmack) আদালতে বলেন, “পিয়ার্স একজন পরিকল্পিত ধর্ষক এবং এখন একজন খুনি। তিনি নিজের বিকৃত ইচ্ছা পূরণের জন্য নির্দোষ মহিলাদের মাদকাসক্ত করতেন।”
ঘটনাটি ঘটে ২০২১ সালের ১৩ নভেম্বরের ভোরে। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি গুদামঘরে অনুষ্ঠিত পার্টিতে পিয়ার্সের সঙ্গে দেখা হয় জাইলস ও ক্যাব্রালেস-আরজোলার। পার্টি শেষে তিনি তাদের বেভারলি হিলসের নিজের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যান। সেখানেই দুই তরুণীকে দেওয়া হয় GHB (একটি “ডেট-রেপ ড্রাগ” নামে পরিচিত মাদক) ও ফেন্টানাইলের সংমিশ্রণ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুই নারী অচেতন অবস্থায় পড়েন।
পুলিশের সূত্রে খবর, এরপর পিয়ার্স ও তার রুমমেট অভিনেতা ব্র্যান্ড্ট অসবোর্ন (Brandt Osborn) দুই নারীকেই শহরের ভিন্ন ভিন্ন হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যান। ক্রিস্টি জাইলসকে কালভার সিটি হাসপাতালে এবং হিলডা ক্যাব্রালেস-আরজোলাকে কাইজার পারমানেন্টে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই জাইলসকে মৃত ঘোষণা করা হয়। টক্সিকোলজি রিপোর্টে তার শরীরে কোকেন, ফেন্টানাইল, কেটামিন ও GHB -এর মারাত্মক মিশ্রণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ক্যাব্রালেস-আরজোলা একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে কয়েকদিনের মধ্যে প্রাণ হারান। জাইলসের মা লেসলি জাইলস (Leslie Giles) মার্কিন সংবাদমাধ্যম CBS 48 Hours-এ বলেন, “আমাকে ফোনে বলা হয়েছিল, ‘আমরা দুঃখিত, কিন্তু আপনার মেয়েকে আমাদের হাসপাতালের বাইরে ফেলে রেখে গিয়েছে, যেন আবর্জনার ব্যাগ।’ আমি তখন ভেঙে পড়েছিলাম।”
প্রসিকিউশন দল জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পিয়ার্স মহিলাদের টার্গেট করতেন, তাদের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে মাদক খাইয়ে জ্ঞান হারানোর পর যৌন নিপীড়ন করতেন। কয়েকজন বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু কেউই সাহস করে মুখ খুলতে পারেননি। অবশেষে ২০২২ সালে, একাধিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ভুক্তভোগীর বয়ানের পর পিয়ার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করা হয়। এই বছরের শুরুতে, লস অ্যাঞ্জেলেস সুপিরিয়র কোর্টে বিচারক তাকে দুই নারীর হত্যাসহ ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের সাতটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত রায় ঘোষণার সময় মন্তব্য করে, “এই সাজা কেবল দুই নারীর জন্য নয়, তা অসংখ্য ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের নিদর্শন।” প্রসঙ্গত, পিয়ার্সের রুমমেট ব্র্যান্ড্ট অসবোর্নকেও সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তবে বিচারক প্রমাণের অভাবে তার বিরুদ্ধে মিসট্রায়াল ঘোষণা করেন। যদিও প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অসবোর্নের পুনর্বিচারের সম্ভাবনা রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ সূত্রে উল্লেখ, এই মামলা শুধু এক ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি পুরো শহরে ফেন্টানাইল (Fentanyl) সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। এই মাদক এখন প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ২০২১ সালে একাই ফেন্টানাইল-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার বেড়েছিল ২৫০%। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হলিউডের ‘পার্টি কালচার’ এখন এমন এক বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে মাদক আর বিনোদনের সীমানা মুছে গিয়েছে। একজন প্রাক্তন সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ডেভিড পিয়ার্স সবসময়ই বিপজ্জনক ছিল। তার পার্টিগুলো ছিল গ্ল্যামারের আড়ালে ভয়ঙ্কর এক ফাঁদ।” উল্লেখ যে, বর্তমানে পিয়ার্স ক্যালিফোর্নিয়ার একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে রয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, তাকে কখনও প্যারোল দেওয়া হবে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Elon Musk : ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ইলন মাস্কের পদত্যাগ: আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রভাব




