প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দিনভর কাজের চাপের পর কিংবা গভীর রাতে পড়াশোনা বা অফিসের ডেডলাইন সামলাতে অনেকেই ভরসা রাখেন এক কাপ কফির (Coffee) উপর। চোখে ঘুম এলেও কফির চুমুকেই যেন ফিরে আসে সতেজতা। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই অভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ, শুধু অনিদ্রা বা ক্লান্তি নয়, রাতে কফি পানের প্রভাব মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনেও পড়তে পারে, এবং নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, ‘রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে’। এতদিন পর্যন্ত কফির নেতিবাচক প্রভাব বলতে মূলত ঘুমের ব্যাঘাতকেই গুরুত্ব দেওয়া হত। কিন্তু এবার বিষয়টি আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখা হচ্ছে। মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে কফির সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
কফির প্রধান উপাদান ক্যাফেইন (Caffeine)। এটি আমাদের মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন (Adenosine) নামের রাসায়নিকের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে। এই অ্যাডেনোসিনই শরীরকে ঘুমের সংকেত দেয়। ফলে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুমের ভাব কমে যায় এবং শরীর জেগে থাকে। কিন্তু এর পাশাপাশি ডোপামিন (Dopamine) -এর মতো নিউরোট্রান্সমিটার সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উদ্দীপিত করে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই অতিরিক্ত উদ্দীপনা রাতের সময় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ফলস্বরূপ, মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কখনও ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, আত্মসংযমের উপর প্রভাব পড়তে পারে। এই পরিবর্তন অনেক সময় দৈনন্দিন জীবনে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি করা হয়েছে ড্রসোফিলা মেলানোজেস্টার (Drosophila Melanogaster) নামের এক ধরনের ফলের মাছির উপর, যা স্নায়ুবিজ্ঞানের পরীক্ষায় বহুল ব্যবহৃত। এই গবেষণায় লক্ষ্য করা যায়, রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ করা মাছিগুলি নেতিবাচক উদ্দীপনার প্রতি নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে কম সক্ষম হয়েছে। সহজভাবে বললে, তারা বেশি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কম ছিল। একই পরিমাণ ক্যাফেইন দিনের বেলায় দেওয়া হলে এই ধরনের আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এই ফলাফল থেকেই উঠে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কখন কফি পান করা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাতের সময় মস্তিষ্কের যে বিশ্রামের প্রয়োজন, ক্যাফেইন সেই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে শুধু ঘুম নয়, চিন্তাভাবনার ধারাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে হরমোনজনিত পার্থক্য, বিপাকক্রিয়ার ভিন্নতা এবং মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনের ভূমিকা থাকতে পারে। ফলে একই পরিমাণ কফি পুরুষ ও নারীর শরীরে আলাদা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
আরও একটি দিক উঠে এসেছে এই গবেষণায়, তা হল ঘুমের মান। রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুম গভীর হয় না। ফলে শরীর বিশ্রাম পেলেও মস্তিষ্ক সম্পূর্ণভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে না। এর প্রভাব পড়ে পরের দিনের কাজের উপর, মনোযোগে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে রাত জাগা অনেকের কাছেই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কাজের চাপ, পড়াশোনা কিংবা বিনোদনের কারণে অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। সেই সময় কফি যেন একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রাতে কফি খাওয়ার ফলে আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাগত সিদ্ধান্ত বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়া বা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু, এর অর্থ এই নয় যে কফি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলতে হবে। বরং সময় নির্বাচনটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দিনের প্রথম ভাগে সীমিত পরিমাণে কফি পান শরীরকে চাঙা রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু রাতের দিকে তা এড়িয়ে চললে ঘুম ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনতার সঙ্গে জীবনযাত্রার অভ্যাসের সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা চলছে, এই গবেষণা সেখানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কফির মতো সাধারণ একটি পানীয়ও যে আমাদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। তাই দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসগুলির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি হয়ে উঠছে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Santragachi Digha train time | গরমে দিঘা ভ্রমণে বড় স্বস্তি! সাঁতরাগাছি-দিঘা পার্মানেন্ট ট্রেন চালু, জানুন সময়সূচী ও স্টপেজ




