সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : ভোটের আগে উত্তপ্ত হচ্ছে বিহারের (Bihar) রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD) নেতা এবং ইন্ডিয়া ব্লকের (INDIA Bloc) মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী তেজস্বী যাদব (Tejashwi Yadav) গত রবিবার ঘোষণা করেছেন, রাজ্যে ক্ষমতায় এলে তাঁর জোট ওয়াকফ (Waqf) সংশোধন আইন “সম্পূর্ণ বাতিল” করবে। পাটনায় (Patna) এক নির্বাচনী সভায় তেজস্বী বলেন, “বিহারের মানুষ ধর্ম বা জাতপাত নয়, ন্যায় ও উন্নয়ন চায়। তাই এই ওয়াকফ সংশোধন আইনকে আমরা ক্ষমতায় এসে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেব।”
তেজস্বীর এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিজেপি (BJP) নেতারা তাঁকে ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’ করার অভিযোগে skewer করেছেন, আবার ইন্ডিয়া ব্লকের শরিক দলগুলি এই বক্তব্যকে “ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের পুনরুত্থান” বলে অভিহিত করেছে। তেজস্বী আরও বলেন, “ক্ষমতায় এসে আমরা পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিনিধিদের ভাতা দ্বিগুণ করব। যারা গ্রামবাংলার উন্নয়নে কাজ করছেন, তাঁদের মর্যাদা দিতে হবে।” এদিনই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশন [CPI (ML) Liberation] নিজেদের ‘সংকল্প পত্র’ প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ভূমিহীনদের জন্য ২১ লক্ষ একর জমি পুনর্বণ্টন করা হবে, কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমিকদের ঋণ মওকুফ করা হবে এবং সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের জন্য ৬৫ শতাংশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “বিহারের জনগণ এবার এমন একটি সরকার চায়, যা আসল উন্নয়নের কথা বলবে, ধর্ম নয়।”
এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) পাল্টা সুরে বলেন, “২০০৫ সালের পর থেকে বিহার আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। আজ বিহারি হওয়া গর্বের বিষয়।” নীতীশের দাবি, তাঁর নেতৃত্বেই বিহার এক সময়ের ‘অপরাধপ্রবণ রাজ্য’ থেকে উন্নয়নের পথে এগিয়েছে। তিনি আরও বলেন, “যারা এখন উন্নয়নের কথা বলছে, তারা অতীতে রাজ্যকে অন্ধকারে ডুবিয়েছিল।” অন্যদিকে, নীতীশের দল জেডি(ইউ) [JD(U)] ১৬ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন একজন বর্তমান বিধায়ক এবং দুই প্রাক্তন মন্ত্রীও, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তাঁরা এনডিএ (NDA)-এর আনুষ্ঠানিক প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রার্থী হয়েছেন।
জনশক্তি জনতা দলের (JJD) নেতা তেজ প্রতাপ যাদব (Tej Pratap Yadav) মহুয়া (Mahua) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, “মহুয়ায় এসে দেখুন, জনসমর্থন কোথায়। কেউ আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। মানুষ জানে, আমরা মুসলমানদের বা কোনও সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করি না।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে বিহারের মূল লড়াই হবে ইন্ডিয়া ব্লক বনাম এনডিএ জোটের মধ্যে। ওয়াকফ ইস্যু, সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির মতো বিষয়ই এবার ভোটের মূল ফ্যাক্টর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেজস্বী যাদব তরুণ ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছেন, তবে নীতীশ কুমারের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এখনও প্রাসঙ্গিক রাখছে।
পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক রাজীব ঝা (Rajeev Jha) বলেন, “তেজস্বী যাদবের ওয়াকফ বিল বাতিলের ঘোষণা একটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি ধর্মীয় বিভাজন নয়, তা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার পক্ষে অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে ভোটের ফলেই বোঝা যাবে, এই ইস্যু কতটা প্রভাব ফেলল।” অন্যদিকে বিজেপি শিবিরে বিশ্বাস করা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদীর একাধিক সভা ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রচার ইন্ডিয়া ব্লকের প্রচারকে ম্লান করে দেবে। দলটির রাজ্য সভাপতি বলেন, “বিহারে উন্নয়ন বিজেপির হাত ধরেই এসেছে। এখন জনগণ সেই ধারাই বজায় রাখতে চাইবে।”
তবে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও বিহারের ভোটাররা এবার কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও কৃষিনীতির প্রশ্নে বেশি মনোযোগী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তরুণ ভোটারদের প্রায় ৩৫ শতাংশ এবার প্রথমবার ভোট দেবেন, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা নিতে পারে। ভোটের প্রচারে এখনো বাকি কিছুদিন। কিন্তু স্পষ্ট, বিহার রাজনীতি আবারও কেন্দ্রের মতোই ধর্ম, উন্নয়ন ও পরিচয়ের ত্রিমুখী সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত




