সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শোকের ছায়া নেমে এল বুধবার সকালে। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত -এর (Anik Dutta) আকস্মিক মৃত্যুর খবরে স্তম্ভিত টলিপাড়া থেকে বুদ্ধিজীবী মহল। হিন্দুস্তান পার্কে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর জখম হওয়ার পর তাঁকে দ্রুত ঢাকুরিয়া সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। এই আকস্মিক ঘটনায় শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন সহকর্মী, বন্ধু এবং অনুরাগীরা। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে পৌঁছে যান অভিনেতা ও বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh)। তিনি জানান, পরিচালকের শেষকৃত্য কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নির্দেশ এসেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর কাছ থেকে। প্রশাসনিক স্তরে যাতে কোনও ত্রুটি না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। রুদ্রনীলের কথায়, ‘এমন একজন গুণী পরিচালকের শেষ বিদায়ে কোনও ঘাটতি রাখা যাবে না, এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছে।’
এ দিকে, অনীক দত্তের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এসএসকেএম (SSKM Hospital) -এ। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তাঁর শেষ যাত্রাপথের সময়সূচিও ঠিক করা হয়েছে। রুদ্রনীল জানান, ‘অনীকদার শেষকৃত্য হবে আগামীকাল। তাঁর মেয়ে ঐশী (Aishi Dutta) বিদেশ থেকে ফিরছেন। তিনি প্রাপ্তবয়স্কা, তাই বাবার সমস্ত নথিপত্র আগে দেখবেন। তার পর বিকেল চারটে নাগাদ নন্দন (Nandan) -এ মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে।’ সেখানে কিছু সময়ের জন্য শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকবে। তার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেওড়াতলা মহাশ্মশান (Keoratala Crematorium)-এ, যেখানে সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য।
বিশেষ সূত্রের খবর, শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেও। যদিও এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবু প্রশাসনিক মহলে জোর জল্পনা তৈরি হয়েছে। অনীক দত্তের মৃত্যুর খবরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁদের দীর্ঘ দিনের কাজের সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অনীকদার সঙ্গে আমার বহু বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। “ভূতের ভবিষ্যৎ” ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছি। তবে “ভবিষ্যতের ভূত”-এ কাজ করা হয়নি। ওঁর রসবোধ ছিল অসাধারণ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনীকদা সব সময় নিজের মতো করে কাজ করতে পছন্দ করতেন। তাঁর সঙ্গে শুধু আড্ডা নয়, মতবিরোধও হয়েছে, তবু সেই সম্পর্ক ছিল ভীষণ প্রাণবন্ত।’ কয়েক দিন আগেই একটি ছবির প্রিমিয়ারে তাঁদের শেষ দেখা হয়েছিল বলে জানান রুদ্রনীল। সেই সময় অনীক দত্ত শরীর খারাপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু এত দ্রুত পরিস্থিতি এমন দিকে যাবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি। ‘ভাবতেই পারছি না, এত তাড়াতাড়ি ওঁকে হারাতে হবে,’ বলেন তিনি।
চলচ্চিত্র জগতের বাইরে, অনীক দত্ত তাঁর স্পষ্টভাষী মনোভাবের জন্যও পরিচিত ছিলেন। কয়েক বছর আগে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর ছবি নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি সরব হয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে রুদ্রনীল বলেন, ‘অনীকদা যা বলেছিলেন, তা নিজের বিশ্বাস থেকেই বলেছিলেন। অনেকেই তখন চুপ ছিলেন, কিন্তু উনি চুপ থাকেননি।’ অনীক দত্তের এই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং নির্ভীক অবস্থান তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। তাঁর কাজের ধরণ, চিন্তাভাবনা এবং বক্তব্য, সব কিছুতেই ছিল নিজস্ব ছাপ। ফলে তাঁর প্রয়াণ শুধুমাত্র চলচ্চিত্র জগত নয়, বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরেও এক বড় শূন্যতা তৈরি করল।
এই ঘটনার পর টলিউডে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। একাধিক পরিচালক, অভিনেতা এবং শিল্পী সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, বাংলা সিনেমা এক সাহসী কণ্ঠ হারাল। উল্লেখ্য, নন্দনে মরদেহ রাখার সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, এই প্রেক্ষাগৃহ কেবল একটি সিনেমা হল নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ রাখা মানে শিল্পীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক বিশেষ উপায়। অনীক দত্তের কর্মজীবনে একাধিক স্মরণীয় ছবি রয়েছে, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন ধরে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রে সমাজের নানা দিক উঠে এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। ব্যঙ্গ, রস এবং বাস্তবতার মিশেলে তিনি তৈরি করেছিলেন এক আলাদা ভাষা। শেষ পর্যন্ত, নন্দন থেকে কেওড়াতলা, এই পথেই সম্পন্ন হবে তাঁর শেষ যাত্রা। প্রিয় পরিচালকের প্রয়াণে শোকাহত বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ এখন অপেক্ষায়, শেষবারের মতো তাঁকে বিদায় জানানোর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : OBC Certificate West Bengal, Suvendu Adhikari OBC decision | ওবিসি শংসাপত্রে বড় রদবদল, ৪ মাসের মধ্যে নতুন সমীক্ষার নির্দেশ, নবান্ন বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কড়া সিদ্ধান্ত



