সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম খুললেই মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে নানা ধরনের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন। তার মধ্যে কিছু বিজ্ঞাপনে উত্তেজক ছবি বা ভিডিয়োর অংশ দেখিয়ে ব্যবহারকারীকে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট দেখার জন্য বিশেষ অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হচ্ছে। বাইরে থেকে সাধারণ বিনোদনের অ্যাপ মনে হলেও সেগুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ঙ্কর অ্যান্ড্রয়েড ম্যালঅয়্যার (Android porn app malware)। এক বার সেই অ্যাপ ফোনে ঢুকে পড়লে শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত তথ্যও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনই বিপজ্জনক সাইবার প্রতারণা নিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রের তরফে প্রকাশিত সতর্কবার্তায় কয়েকটি সন্দেহজনক পর্ন অ্যাপের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে ‘নাইট প্লে’, ‘রিলুপ’, ‘কিস’, ‘ভিমো’, ‘রিভো’, ‘নেক্সো’ ও ‘ভিক্সা’। কেন্দ্রের অধীনস্থ সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম থ্রেট অ্যানালিটিক্স ইউনিট’ (NCTAU) জানিয়েছে, এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহারকারীর অজান্তে ফোনের গুরুত্বপূর্ণ অনুমতি নিয়ে নিতে পারে এবং পরে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর্থিক প্রতারণা চালানো সম্ভব।
সাইবার প্রতারণার পদ্ধতিটিও বেশ কৌশলী। সাধারণত প্রথমে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সমাজমাধ্যমে একটি বিজ্ঞাপন দেখা যায়। বিজ্ঞাপনে পর্নোগ্রাফিক ভিডিয়ো বা আকর্ষণীয় ছবির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর নজর টানা হয়। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই ব্যবহারকারীকে অন্য একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিনামূল্যে ভিডিয়ো দেখা বা বিশেষ কনটেন্ট পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। বিপদের জায়গাটি হল, এই অ্যাপগুলি সাধারণত গুগ্ল প্লে স্টোরে পাওয়া যায় না। ব্যবহারকারীকে ব্রাউজ়ারের মাধ্যমে একটি APK ফাইল ডাউনলোড করতে বলা হয়। অর্থাৎ গুগ্ল প্লে স্টোরের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ফোনে অ্যাপটি ইনস্টল করতে হয়। অনেক সময় বিজ্ঞাপনে এমন ভাবে পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে ব্যবহারকারী না বুঝেই অচেনা ওয়েবসাইট থেকে APK ফাইল নামিয়ে ফেলেন।
অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল করার পরে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ। অ্যাপ খুললেই একাধিক অনুমতি চাওয়া হয়। ফোনের বিভিন্ন ফিচার ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করে অনেকেই সেই অনুমতিগুলি দিয়ে দেন। কিন্তু সেই অনুমতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে বিপদের মূল কারণ। বিশেষ করে Accessibility Permission-এর মতো সুবিধা চালু করে দিলে ক্ষতিকারক অ্যাপটি ফোনের বিভিন্ন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পেতে পারে। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন ‘ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার’ (I4C) -এর শাখা NCTAU গত ২৬ অগস্ট প্রকাশিত সতর্কবার্তায় এই পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক অ্যাপগুলি এমন কিছু অনুমতি চাইতে পারে, যার মাধ্যমে ফোনে আরও সফ্টওয়্যার ইনস্টল করা অথবা Android Accessibility ব্যবস্থার অপব্যবহার করা সম্ভব। এক বার সেই নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। শুধু ফোনের পর্দা দেখা নয়, এই ধরনের ম্যালঅয়্যার ব্যবহারকারীর টাইপ করা তথ্য, OTP কিংবা PIN-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। ফলে মোবাইল ব্যাঙ্কিং, UPI বা অন্যান্য ডিজিটাল লেনদেন আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী বুঝে ওঠার আগেই অননুমোদিত লেনদেন হয়ে যেতে পারে।
আরও একটি কৌশলের কথাও জানিয়েছে NCTAU। কিছু ক্ষতিকারক অ্যাপ ফোনে একটি VPN ইনস্টল করার চেষ্টা করতে পারে। সেই VPN-এর মাধ্যমে ফোনের ইন্টারনেট ট্র্যাফিক এমন সার্ভারের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব, যা প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে ফোন থেকে কোন তথ্য কোথায় যাচ্ছে, তার উপর ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও তখন বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই প্রতারণার শুরু সাধারণত একটি সমাজমাধ্যম বিজ্ঞাপন থেকে হলেও আসল লক্ষ্য থাকে ব্যবহারকারীকে একটি ভুয়ো বা ফিশিং ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া। সেই ওয়েবসাইটে নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে Google Play Store-এর বাইরে থেকে APK ডাউনলোড করানো হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনে ক্লিক করা থেকে শুরু করে অ্যাপ ইনস্টল এবং অনুমতি দেওয়ার প্রতিটি ধাপই পরিকল্পিত ভাবে সাজানো থাকতে পারে।
কেন্দ্রের সতর্কবার্তায় আরও জানানো হয়েছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রথম অ্যাপটি ইনস্টল হওয়ার পরে ‘আপডেট’-এর নাম করে আরও একটি সফ্টওয়্যার বা প্যাকেজ ফোনে ঢুকিয়ে দেওয়া হতে পারে। ব্যবহারকারী ভাবতে পারেন, স্বাভাবিক অ্যাপ আপডেট হচ্ছে। কিন্তু সেই দ্বিতীয় প্যাকেজের মাধ্যমে ফোনের উপর আক্রমণকারীদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে। এই ধরনের বিপদ থেকে বাঁচতে ব্যবহারকারীদের কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্র। অচেনা ওয়েবসাইট, বিজ্ঞাপন বা সন্দেহজনক লিঙ্ক থেকে কোনও APK ফাইল ডাউনলোড না করার কথা বলা হয়েছে। অ্যাপ ইনস্টলের ক্ষেত্রে Google Play Store বা নির্ভরযোগ্য অ্যাপ স্টোর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনও অ্যাপ অপ্রয়োজনীয় ভাবে Accessibility Permission চাইলে তা অনুমোদন না করাই নিরাপদ।
নিজের ফোনে ইতিমধ্যে কোন কোন অ্যাপ ইনস্টল রয়েছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি। অচেনা বা সন্দেহজনক কোনও অ্যাপ নজরে এলে সেটি সম্পর্কে যাচাই করে প্রয়োজন হলে মুছে ফেলতে হবে। পাশাপাশি Google Play Protect চালু রাখা এবং Android-এর নিরাপত্তা আপডেট নিয়মিত ইনস্টল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফোনে ম্যালঅয়্যার ঢুকে পড়েছে বলে সন্দেহ হলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও UPI লেনদেনের উপর নজর রাখা দরকার। অস্বাভাবিক কোনও লেনদেন চোখে পড়লে দ্রুত ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। পাশাপাশি সন্দেহজনক অ্যাপের Accessibility Permission বন্ধ করা ও প্রয়োজন হলে Device Administrator-এর অনুমতিও বাতিল করার পরামর্শ রয়েছে।
উল্লেখ্য, আক্রান্ত ফোন থেকে অ্যাপ সরাতে না পারলে সেফ মোডে ফোন চালু করে সন্দেহজনক সফ্টওয়্যার মুছে ফেলার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাতেও সমস্যা থেকে গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ নিয়ে ফ্যাক্টরি রিসেট করার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। তবে ফ্যাক্টরি রিসেটের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করা জরুরি। সাইবার প্রতারণার শিকার হলে দেরি না করে অভিযোগ জানানোর উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতারণার ক্ষেত্রে দ্রুত ১৯৩০ নম্বরে ফোন করার পরামর্শ রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সাইবার অপরাধ রিপোর্টিং পোর্টালেও অভিযোগ জানানো যায়। কারণ ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে যত দ্রুত অভিযোগ করা যায়, ক্ষতির পরিমাণ কমানোর সুযোগ তত বাড়ে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে চোখে পড়া একটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে কয়েক মিনিটের মধ্যে কী ভাবে একটি ফোন সাইবার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, কেন্দ্রের সতর্কবার্তায় সেই ছবিই উঠে এসেছে। তাই পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের লোভ দেখানো অচেনা বিজ্ঞাপন, সন্দেহজনক ওয়েবসাইট এবং APK ফাইল নিয়ে Android ব্যবহারকারীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Deepika Padukone Viral Interview, Cocktail 2 Box Office | ‘মেয়েরা ফ্লার্ট করলে সেটাই বড় কমপ্লিমেন্ট’ : পুরনো সাক্ষাৎকারে দীপিকার মন্তব্যে ফের ঝড়




