প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : সন্তানকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে অনেক বাবা-মা ছোট থেকেই মোবাইল ফোন, টেলিভিশন কিংবা নানা রকম ডিজিটাল বিনোদনের সাহায্য নেন। কিন্তু বলিউড অভিনেত্রী অমৃতা রাও (Amrita Rao) ও তাঁর স্বামী, রেডিয়ো জকি আনমোল (RJ Anmol) বেছে নিয়েছিলেন একেবারে অন্য পথ। ছেলের শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর তাঁকে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন কিংবা কোনও ধরনের গ্যাজেটের সংস্পর্শে আসতে দেননি তাঁরা। এমনকী সন্তানকে সময় কাটানোর জন্য টিভি বা ভিডিয়োর উপর নির্ভর না করে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনেও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন এই দম্পতি। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে গল্প শোনা, ছড়া শেখা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁদের নিজস্ব পরিকল্পনা। সম্প্রতি এক পডকাস্টে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও ছেলে বীরকে (Veer) বড় করে তোলার এই বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে মুখ খুলেছেন অমৃতা।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সন্তান প্রতিপালন নিয়ে বাবা-মায়ের দায়িত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ছোটদের সঙ্গে সময় কাটানোর গুরুত্ব। অমৃতার কথায়, মাতৃত্বের অন্যতম আনন্দের জায়গা ছিল ছেলেকে জীবনের প্রথম পাঁচ বছর গ্যাজেট থেকে দূরে রাখতে পারা। এই সিদ্ধান্ত কোনও সাময়িক আবেগের বশে নেওয়া হয়নি।
সন্তান জন্মের আগে থেকেই অমৃতা ও আনমোল বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, শৈশবের প্রথম কয়েকটি বছর শিশুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, কথোপকথন ও পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া প্রয়োজন। সেই কারণেই তাঁদের বাড়িতে টেলিভিশন পর্যন্ত রাখা হয়নি। মোবাইল ফোন বা অন্য কোনও পর্দার মাধ্যমে শিশুকে ব্যস্ত রাখার অভ্যাসও তৈরি করতে চাননি তাঁরা। অভিনেত্রীর এই সিদ্ধান্তের পিছনে পরিবারের চিকিৎসক এক তুতো-ভাইয়ের অভিজ্ঞতাও কাজ করেছিল। তিনি আমেরিকায় থাকেন ও নিজের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই স্ক্রিনের ব্যবহার থেকে দূরে রেখেছিলেন। অমৃতা তাঁর ভাইয়ের পরিবারের অভিজ্ঞতা শুনে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী হন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, ছোটদের প্রথম দিকের জীবনযাপনে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখলে তাদের নিজস্বভাবে শেখা ও বোঝার সুযোগ বাড়তে পারে। সেই ভাবনা থেকেই নিজের সন্তান বীরের ক্ষেত্রেও অমৃতা রাও একই ধরনের পারিবারিক নিয়ম চালু করার সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই যে তা বাস্তবায়ন করা সহজ, এমনটা নয়। একটি বাড়িতে টেলিভিশন না রাখা কিংবা শিশুর সামনে মোবাইল ফোন না ব্যবহার করার জন্য পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। অমৃতা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে পরিবারের প্রত্যেককে এই নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল। কারণ, বর্তমানে ছোটদের শান্ত রাখতে কিংবা খাওয়ানোর সময় ব্যস্ত রাখতে মোবাইলের পর্দা দেখানোর প্রবণতা অনেক পরিবারেই দেখা যায়। কিন্তু তাঁরা সেই অভ্যাস তৈরি করতে চাননি। অনমোলও স্ত্রীর সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, বাবা-মা হিসেবে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলেও সন্তানের জন্য তাঁরা যে পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন, তা তাঁদের পরিবারের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে। বীরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অমৃতা অন্য একটি অভ্যাস তৈরি করেছিলেন। গর্ভাবস্থা চলাকালীনই সন্তানের সঙ্গে অমৃতা নিয়মিত কথা বলতেন।সন্তান জন্মের পরও সেই অভ্যাস বজায় রাখেন। কোলে নেওয়া, খাওয়ানো কিংবা ঘুম পাড়ানোর সময় সহজ শব্দ ও ছোট ছোট বাক্যে ছেলের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর বিশ্বাস, শিশুরা বড়দের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কথা শুনতে পারে এবং চারপাশের শব্দ ও ভাষার সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়। তাই ভিডিয়ো দেখানোর পরিবর্তে কথোপকথনের মাধ্যমেই বীরের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন অমৃতা রাও।
শুধু কথাবার্তা নয়, বীরের ছোটবেলার বিনোদনের জন্য অডিয়ো স্টোরি এবং ছড়াকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন অমৃতা ও অনমোল। জন্মের পর থেকেই ছেলেকে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় গল্প ও ছড়া শোনানো হত। আনমোলের বক্তব্য, বাবা-মা যখন কোনও কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার পরিবর্তে অডিয়ো শোনানোর ব্যবস্থা করা যেত। তাঁদের মতে, গল্প শোনা ও ছড়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে বীরের শব্দ শেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সন্তান প্রতপালনের দায়িত্বও দু’জনে ভাগ করে নিয়েছিলেন। অমৃতার দাবি, ছেলে বড় করার ক্ষেত্রে তিনি ও আনমোল সমানভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও অনমোল একবার জানিয়েছিলেন, কোনও কোনও সময়ে তিনি স্ত্রীর তুলনায় বেশি দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁদের মতে, সন্তানকে বড় করার কাজ শুধু মায়ের একার নয়। বাবা-মা দু’জনেরই সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু, সন্তানকে কী ভাবে বড় করা হবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কখনও মতপার্থক্য তৈরি হয়নি, এমন না। অনমোলের বক্তব্য অনুযায়ী, বাবা-মা দু’জনেই সন্তানের ভালর কথা ভেবে আলাদা আলাদা পদ্ধতিকে সঠিক বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু সেই দুই মতের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে ঐক্য থাকা প্রয়োজন। তাই বীরের লালনপালন নিয়ে কোনও মতের অমিল তৈরি হলে দু’জনে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করতেন। তাঁদের কাছে সন্তানকে ঘিরে পারিবারিক বোঝাপড়াও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

বীরের খাবারের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতেন এই তারকা দম্পতি। অমৃতা জানিয়েছেন, ছেলেকে তাঁরা সাত্ত্বিক খাবার খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্যাকেটজাত খাবার দেওয়ার প্রবণতাও এড়িয়ে চলতেন। বিশেষ করে চকোলেট, বিস্কুট কিংবা অন্য মুখরোচক খাবার দেওয়ার আগে বাবা-মায়ের অনুমতি নেওয়া উচিত বলে মনে করেন অভিনেত্রী। তাঁর অভিজ্ঞতায়, অনেক সময় আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতরা স্নেহের বশে শিশুদের হাতে চকোলেট কিংবা বিস্কুট তুলে দেন। কিন্তু শিশুর খাবারের অভ্যাস তৈরি করার ক্ষেত্রে পরিবারের নির্ধারিত নিয়মের গুরুত্ব আছে। এ প্রসঙ্গে একটি মজার ঘটনার কথাও জানিয়েছেন অনমোল। একবার একটি দোকানের কর্মী বীরকে চকোলেট দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছোট্ট বীর নাকি তা নিতে রাজি হয়নি। উল্টে সে বলেছিল, ‘আমি চকোলেট খাই না, আপনারও খাওয়া উচিত নয়।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়েছিলেন দম্পতি।
শুধুই জন্মদিনের অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক জমায়েতে খাবারের নিয়ম বজায় রাখা যে সব সময় সহজ হয় না, সেটাও তাঁরা স্বীকার করেছেন। মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোভিড অতিমারির প্রসঙ্গও তুলেছেন অমৃতা। তাঁর মতে, অতিমারি তাঁকে পৃথিবী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। গর্ভধারণের আগে যদি অতিমারির পরিস্থিতি তৈরি হত, তা হলে হয়তো সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন না বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তবে এই মন্তব্যের মাধ্যমে মাতৃত্ব নিয়ে কোনও অনুশোচনা তিনি প্রকাশ করেননি। অনিশ্চিত পরিস্থিতি একজন মানুষকে কতটা গভীর ভাবে ভাবতে বাধ্য করে, সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য। মা হওয়ার পর নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অমৃতা। তাঁর মতে, সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনও মহিলার নিজের স্বপ্ন, কাজ কিংবা পছন্দকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। আর্থিক স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজের পেশাগত পরিচিতিও একজন মহিলাকে আত্মতৃপ্তি দিতে পারে। অন্যের সাফল্যের মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার না করে নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলার পরামর্শএল্ব তিনি দিয়েছেন।
অমৃতা ও অনমোলের এই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁদের পারিবারিক জীবনযাপনের একটি আলাদা ছবি পাওয়া যায়। তবে তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তকে প্রত্যেক বাবা-মায়ের জন্য বাধ্যতামূলক কোনও নিয়ম বলে দাবি করেননি। নিজেদের সন্তানের স্বভাব, পারিবারিক পরিস্থিতি ও পছন্দ অনুযায়ী এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে দাঁড়িয়ে পাঁচ বছর ছেলেকে টিভি ও গ্যাজেট থেকে দূরে রাখার তাঁদের সিদ্ধান্ত তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পর্দার বাইরে গল্প, ছড়া, কথোপকথন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েই বীরের শৈশব সাজাতে চেয়েছেন এই তারকা দম্পতি।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mizoram Ginger Capital | ভারতের ‘আদার রাজধানী’ কোন রাজ্য? কেন এত কদর মিজোরামের আদার, জানুন গুণমান ও চাষের রহস্য



