সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে ব্যাট হাতে আবারও নিজের জাত চিনিয়েছেন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫১ বলে ৭৪ রানের দুরন্ত ইনিংস খেলেছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁর ব্যাটিংয়ের উপর ভর করেই ম্যাচে জয়ের ভিত তৈরি করেছে ভারতীয় দল। কোহলির এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পরেই তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ক্রিকেট মহলে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু তাঁর এক দিনের ক্রিকেটের দক্ষতা না, টেস্ট ক্রিকেট থেকে তাঁর অবসরের সিদ্ধান্তও। ভারতের প্রাক্তন কোচ রবি শাস্ত্রীর (Ravi Shastri) মন্তব্য ঘিরে সেই বিতর্কই নতুন করে উসকে উঠেছে। শাস্ত্রীর মতে, কোহলির মধ্যে এখনও পাঁচ দিনের ক্রিকেটে খেলার মতো শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে। তা হলে কেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি? শাস্ত্রীর বক্তব্যের পর ক্রিকেট মহলে উঠছে সেই প্রশ্ন।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একদিনের ম্যাচে কোহলির ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হয়েছেন শাস্ত্রী। সম্প্রচারকারী চ্যানেলে ম্যাচের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি কোহলিকে সাদা বলের ক্রিকেটে সর্বকালের অন্যতম সেরা নয়, সেরাদের শীর্ষে রেখেছেন। তাঁর মতে, যে ধরনের পরিবেশে ওই ম্যাচ খেলা হয়েছে, সেখানে কোহলির মতো নিখুঁত ব্যাটিং করা সহজ ছিল না। পিচের পরিস্থিতি ব্যাটারদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হলেও কোহলি নিজের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রেখেছেন। পরিস্থিতি বুঝে শট নির্বাচন থেকে শুরু করে ইনিংসের গতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর পরিণত ব্যাটিংয়ের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। শাস্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোহলির ইনিংসে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি। শুরু থেকেই তিনি নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাট করেছেন। প্রতিপক্ষের বোলারদের চাপে রেখে রান সংগ্রহ করার পাশাপাশি উইকেটের চরিত্রও বুঝে নিয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটার। শাস্ত্রীর মতে, সাম্প্রতিক সাত থেকে দশ বছরের মধ্যে কোহলির এমন ব্যাটিং প্রদর্শন খুব বেশি দেখা যায়নি। এই ইনিংসের মধ্যে অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ফুটে উঠেছে।
বিরাট কোহলির ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করতে গিয়ে শাস্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, একই পিচে অন্য ব্যাটারদের যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, কোহলি সেখানে নিজের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। বিশ্বমানের ক্রিকেটারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল কঠিন পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসা। কোহলি দীর্ঘদিন ধরে সেই কাজ করে আসছেন। এক সময় ভারতীয় দলের কোচ হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন শাস্ত্রী। অধিনায়ক কোহলির প্রস্তুতি, অনুশীলন, ম্যাচের আগে মানসিক অবস্থান ও মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই কোহলির সাম্প্রতিক ইনিংসকে তিনি নিছক একটি ভাল পারফরম্যান্স হিসেবে দেখতে রাজি নন। সাদা বলের ক্রিকেটে কোহলির দীর্ঘদিনের সাফল্যের পিছনে তাঁর ধারাবাহিকতাকে সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করেন শাস্ত্রী।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিপুল রান, শতরানের সংখ্যা ও দলের জয়ে বিরাট কোহলির অবদান ইত্যাদি সব কিছুই কোহলিকে অন্যদের থেকে আলাদা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। শাস্ত্রীর মতে, পরিসংখ্যানই তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শুধু ব্যক্তিগত রান সংগ্রহ নয়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাট করার ক্ষমতাও কোহলির অন্যতম বড় সম্পদ। বহু ম্যাচে চাপের মুখে দায়িত্ব নিয়ে ভারতকে জয়ের পথে এগিয়ে দিয়েছেন তিনি। এক দিনের ক্রিকেটে তাঁর এই দীর্ঘ সাফল্যকে কোনও একটি ইনিংস দিয়ে বিচার করা যায় না। কিন্তু শাস্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি এসেছে টেস্ট ক্রিকেট প্রসঙ্গে। তাঁর মতে, কোহলির এখনও পাঁচ দিনের ক্রিকেট খেলার সম্পূর্ণ সামর্থ্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা একাধিক ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও কোহলিকে টেস্ট দলে দেখতে চাইবেন বলে দাবি করেছেন শাস্ত্রী। তাঁর যুক্তি, কোহলির ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও কারণ নেই। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের শরীরকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের উপযোগী রাখার জন্য যে পরিশ্রম প্রয়োজন, কোহলি এখনও তা করে চলেছেন। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষেত্রেও তাঁর অভিজ্ঞতা যথেষ্ট।
শাস্ত্রীর বক্তব্যের মূল দিক, একজন ক্রিকেটার যখন এখনও নিজের সেরা পর্যায়ে খেলার মতো প্রস্তুত, তখন শুধুমাত্র বয়স বা অন্য কোনও অনুমানের ভিত্তিতে তাঁর টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। কোহলি এখনও টেস্ট ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন বলেই মনে করেন ভারতের প্রাক্তন কোচ। তাঁর মতে, লাল বলের ক্রিকেটে কোহলির অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতা ভারতীয় দলের কাজে লাগতে পারত। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে একজন অভিজ্ঞ ব্যাটারের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, গত বছর মে মাসে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন বিরাট কোহলি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনেককেই বিস্মিত করেছিল। কারণ, তার আগে পর্যন্ত দীর্ঘদিন ভারতীয় টেস্ট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবেও লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বিদেশের মাটিতে ভারতের একাধিক স্মরণীয় পারফরম্যান্সের পিছনে কোহলির নেতৃত্ব ও ব্যাটিং বড় ভূমিকা নিয়েছিল। টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তাঁর আগ্রহ, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা ও ফিটনেস নিয়ে বরাবরই আলোচনা হয়েছে। ফলে আচমকা অবসরের সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর থেকেই তার কারণ নিয়ে নানা মহলে জল্পনা শুরু হয়।
কিন্তু, কেন তিনি টেস্ট ক্রিকেট ছাড়লেন, সেই বিষয়ে কোহলি নিজে বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা দেননি। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার, ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচী, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর প্রয়োজন কিংবা নিজের খেলার ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবনা, বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এর কোনওটিকেই তাঁর অবসরের নিশ্চিত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বর্তমান কোচ গৌতম গম্ভীরের (Gautam Gambhir) প্রসঙ্গও নতুন করে সামনে এসেছে। ক্রিকেট মহলের একাংশের ধারণা, দলের অন্দরের পরিস্থিতি কিংবা কোচিং সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত কোহলির অবসরের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকী গম্ভীরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোহলির অবসরের সিদ্ধান্তে গম্ভীরের কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে এই ধরনের জল্পনাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।
তথাপি, শাস্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে গম্ভীরকে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরাসরি কারও নাম করে কোনও অভিযোগ না তুললেও, কোহলির টেস্ট খেলার সামর্থ্য নিয়ে তাঁর জোরালো সওয়াল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন কোহলি নিজেই লাল বলের ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তখন তাঁর এখনও খেলার যোগ্যতা রয়েছে বলে শাস্ত্রীর মন্তব্য ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, প্রাক্তন ভারতীয় কোচের এই বক্তব্যের মধ্যে বর্তমান দলের পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে পরোক্ষ সমালোচনার ইঙ্গিত রয়েছে। যদিও শাস্ত্রী নিজে গম্ভীরকে নিশানা করে কোনও মন্তব্য করেননি। ভারতীয় ক্রিকেটে কোহলির মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারের উপস্থিতি যে কোনও দলের কাছেই মূল্যবান। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোহলি টেস্ট ক্রিকেটে ফিরতে আগ্রহী কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত তাঁর কাছেই রয়েছে। শাস্ত্রীর মন্তব্য অবশ্য একটি বিষয় নতুন করে সামনে এনেছে, শারীরিক সক্ষমতা এবং ক্রিকেটীয় দক্ষতার বিচারে কোহলির টেস্ট কেরিয়ার আরও কিছুটা দীর্ঘ হতে পারত কি না। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৭৪ রানের ইনিংসের পর সেই আলোচনা আরও জোর পেয়েছে। এখন দেখার, কোহলি নিজে এই বিষয়ে কখনও মুখ খোলেন কি না। আপাতত তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা এবং টেস্ট অবসর ঘিরে বিতর্ক, দুই বিষয়ই ভারতীয় ক্রিকেটের আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Govinda meets Yogi Adityanath | কৃষ্ণমূর্তি হাতে যোগীর সাক্ষাৎকে ‘স্বর্গীয়’ বললেন গোবিন্দা, ব্যক্তিগত ঝড়ের মাঝেই রাজনীতির গুঞ্জন



