সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২ অক্টোবর ২০২৬: বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় মুরাসুকে (Cyclone Murasu) ঘিরে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। তবে এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা আপাতত নেই। ঝড়ের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর রাজ্যের তাপমাত্রায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই রাতের দিকে বাড়তে পারে শীতের অনুভূতি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে রাতের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে। ফলে ভোর এবং রাতের দিকে হালকা শীতের আমেজ অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে তাপমাত্রা নামতে পারে আরও কিছুটা। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার আবহাওয়াতেও ধীরে ধীরে বদল আসার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এখনই রাজ্যে পুরোদস্তুর শীতের আগমনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতে নারাজ আবহাওয়াবিদরা।

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের আবহাওয়াবিদ সৌরিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Sourish Bandyopadhyay) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর গতিপথ বাংলার দিকে না থাকায় রাজ্যের আবহাওয়ায় বড়সড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দুর্বল হয়ে গেলে তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিশেষ করে রাতের পারদ নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী কয়েক দিনে দিনের তাপমাত্রায় খুব বেশি ওঠানামা না হলেও রাতের আবহাওয়ায় কিছুটা ঠান্ডার অনুভূতি বাড়বে। ফলে দিনের তুলনায় রাত এবং ভোরের আবহাওয়ায় বেশি পরিবর্তন লক্ষ করা যেতে পারে বলে উল্লেখ। বর্তমানে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দিনের বেলায় রোদের তেজ থাকলেও রাতের দিকে আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক হতে পারে। আবহাওয়া দফতরের হিসাব অনুযায়ী, প্রথমদিকে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। পরবর্তী সময়ে তা কমে ২২ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাপমাত্রার এই পতন ঘটলে শহরের বাসিন্দারা রাতের দিকে শীতের প্রাথমিক অনুভূতি পেতে পারেন।
কিন্তু, কলকাতার তুলনায় পশ্চিমের জেলাগুলিতে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা বেশি। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম ও ঝাড়গ্রামের মতো পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে রাতের আবহাওয়া তুলনামূলক ঠান্ডা হতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৫ নভেম্বর থেকে পরবর্তী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই জেলাগুলিতে তাপমাত্রার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রাম ও পশ্চিমাঞ্চলের এলাকায় শীতের আমেজ আগে অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বসবাস করেন, তাঁদের কাছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আবহাওয়ার এই বদল স্বস্তিদায়ক হতে পারে। দিনের বেলায় উষ্ণতা বজায় থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে শীতের আগমনের ইঙ্গিত মিলবে। তবে এই পরিবর্তনকে এখনই শীতের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে দেখতে চাইছে না আবহাওয়া দফতর। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের জন্য রাজ্যের সব জায়গায় একই সময়ে তাপমাত্রা কমে না।
সৌরিশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল, দক্ষিণের উপকূলবর্তী এলাকা এবং পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলের আবহাওয়া এক রকম নয়। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের মতো পাহাড়ি এলাকায় শীতের অনুভূতি অনেক আগেই তৈরি হয়। অন্য দিকে, কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে তাপমাত্রা কমার প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর হতে পারে। আবার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া কিংবা পশ্চিম বর্ধমানের মতো জেলায় রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমার প্রবণতা দেখা যায়। তাই গোটা রাজ্যে শীত কবে থেকে শুরু হবে, তার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করা আবহাওয়াগতভাবে কঠিন। উল্লেখ্য, বর্ষার মতো শীতের আগমনেরও কোনও নির্দিষ্ট সূচনাদিন নেই। বর্ষার ক্ষেত্রে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ এবং প্রত্যাহারের মতো কিছু নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত মাপকাঠি রয়েছে। কিন্তু শীতের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, আর্দ্রতা ও স্থানীয় ভৌগোলিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে শীতের অনুভূতি তৈরি হয়। ফলে কোথাও নভেম্বরের শুরুতেই ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে, আবার কোথাও ডিসেম্বরের আগে শীতের প্রকোপ তেমন বাড়ে না। এ কারণেই আবহাওয়া দফতর আপাতত তাপমাত্রার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছে।
অন্য দিকে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড় মুরাসুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ভারতের উপকূলবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি শক্তি বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২ নভেম্বর ঝড়টির শক্তি আরও বাড়তে পারে। এরপর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ৩ নভেম্বর ভোররাতে অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নেল্লোরের কাছাকাছি এলাকায় স্থলভাগে আছড়ে পড়তে পারে এই ঘূর্ণিঝড়। হাওয়া অফিস সূত্রে খবর, স্থলভাগে প্রবেশের সময় মুরাসুর গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ফলে অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ উপকূলবর্তী এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ এবং শক্তির পরিবর্তনের উপর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট এলাকার আবহাওয়ার পরিস্থিতি।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মুরাসুর সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। ঘূর্ণিঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ বাংলার উপকূল থেকে অনেকটাই দূরে। তাই রাজ্যে বড় ধরনের ঝড় কিংবা ব্যাপক বৃষ্টির আশঙ্কা আপাতত করা হচ্ছে না। যদিও স্থানীয়ভাবে দু-এক জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান এবং তার সঙ্গে যুক্ত বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ায় সামান্য ওঠানামা হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের এখন লক্ষ্য মূলত ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশ ও তার পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে। মুরাসু অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করার পর বঙ্গোপসাগরের বায়ুপ্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তার উপর নির্ভর করবে বাংলার তাপমাত্রার গতিপ্রকৃতি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেটে গেলে রাতের তাপমাত্রা কমার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়িত হয় কি না, তা আগামী কয়েক দিনেই বোঝা যাবে।
উল্লেখ্য, নভেম্বরের শুরুতে শীতের অপেক্ষায় থাকা বাংলার মানুষের কাছে এই পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কালীপুজো ও দীপাবলির পর থেকেই দক্ষিণবঙ্গের মানুষ সাধারণত শীতের আমেজের অপেক্ষা করেন। কিন্তু এ বছর আবহাওয়ার পরিবর্তনের গতি কেমন হবে, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। কলকাতায় রাতের তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৩ ডিগ্রিতে নামলে হালকা শীত অনুভূত হলেও জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়তে আরও সময় লাগতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে অবশ্য ২০ থেকে ২১ ডিগ্রির ঘরে পারদ নামলে শীতের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি বোঝা যাবে। অতএব, ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর কারণে বাংলায় বড় কোনও দুর্যোগের আশঙ্কা না থাকলেও তার পরবর্তী আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। নভেম্বরের ৫ তারিখ থেকে তাপমাত্রার পতন কতটা হয়, কলকাতায় রাতের পারদ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং পশ্চিমের জেলাগুলিতে ঠান্ডা কতটা বাড়ে, আপাতত সেটাই দেখার। কিন্তু এখনই লেপ-কম্বল নামানোর সময় এসেছে কি না, তার উত্তর দিতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kolkata Durga Puja 2026: Photo Album | কলকাতার পুজোয় ২০২৬-এ কোন ক্লাব কী ভাবনায় মণ্ডপ সাজিয়েছিল? ঘরে বসেই আবার দর্শন করুন প্রতিমা ও মণ্ডপ



