সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগণা, ১ অক্টোবর ১০২৬: মতুয়া সমাজের উন্নয়ন, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নে বড়সড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। রবিবার ঠাকুরনগরের (Thakurnagar) ঠাকুরবাড়িতে আন্তর্জাতিক গোঁসাই সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন। মতুয়া উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, পৃথক ঠাকুরনগর পুরসভা গঠন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (Citizenship Amendment Act) অনুযায়ী শংসাপত্র প্রদান এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে একগুচ্ছ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, মতুয়া সমাজের কোনও পরিবার যাতে সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক স্তরে আলাদা নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি নাগরিকত্বের নথি পাওয়ার পর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম ঠাকুরনগরে শুভেন্দু অধিকারী। ফলে রবিবারের এই কর্মসূচীকে ঘিরে মতুয়া সমাজের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির আন্তর্জাতিক গোঁসাই সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক, দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মতুয়া সমাজের উন্নয়ন, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে ঠাকুরনগরের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর একাধিক ঘোষণা আগামী দিনে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মতুয়া উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, মতুয়া সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি উঠে এসেছে। বিশেষ করে ঠাকুরনগর ও সংলগ্ন এলাকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নাগরিক পরিষেবা, শিক্ষা ও সামাজিক পরিকাঠামো নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত অর্থ কোন কোন খাতে খরচ হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হলে প্রকল্পের বাস্তব পরিসর সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিনের সভায় পৃথক ঠাকুরনগর পুরসভা গঠনের আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে ঠাকুরনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নাগরিক পরিষেবা, প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং স্থানীয় উন্নয়নের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দাবি রয়েছে। পৃথক পুরসভা তৈরি হলে এলাকার প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনায় নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। পানীয় জল, নিকাশি, রাস্তা, পথবাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। তবে পুরসভা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সীমানা নির্ধারণ ও পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাস বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেদিকে নজর থাকবে এলাকার বাসিন্দাদের। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মতুয়া সমাজের নাগরিকত্বের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেন শুভেন্দু। সিএএ কার্যকর করার প্রসঙ্গ তুলে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বে মতুয়া সম্প্রদায়ের নাগরিকত্বের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে করোনা অতিমারির কারণে এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) সঙ্গে ঠাকুরনগরে আসার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৬ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সিএএ-র নিয়মাবলি প্রকাশ করে। অমিত শাহ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের পথে কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সিএএ নিয়ে রাজ্যের পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) অবস্থানেরও সমালোচনা করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করে মতুয়া সমাজের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। এ দিনের সভায় তিনি রাজনৈতিক পালাবদলের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, ঠাকুর সম্প্রদায়ের মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। পাশাপাশি পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও উল্লেখ করেন। মঞ্চ থেকে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও মতুয়া সমাজের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বিজেপির অবস্থান তুলে ধরেন। নাগরিকত্বের শংসাপত্র প্রদানের সময়সীমা নিয়েও বড় আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিএএ সংক্রান্ত শুনানির প্রক্রিয়া শেষ করে যোগ্য আবেদনকারীদের হাতে নাগরিকত্বের শংসাপত্র তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, যাঁরা সিএএ-র আওতায় আবেদন করেছেন, তাঁদের নথি যাচাই ও শুনানির কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে কতজন আবেদনকারীর শুনানি বাকি রয়েছে, কতগুলি আবেদন ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং শংসাপত্র প্রদানের নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে। শুধু নাগরিকত্বের শংসাপত্র নয়, তফসিলি জাতির শংসাপত্র বা এসসি সার্টিফিকেট (Scheduled Caste Certificate) পাওয়ার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যোগ্য ব্যক্তিরা যাতে প্রয়োজনীয় জাতিগত শংসাপত্র পান, তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকত্বের নথি ও জাতিগত শংসাপত্র, দুই ক্ষেত্রেই আবেদনকারীদের যাতে অহেতুক সমস্যার মুখে পড়তে না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার কথা তিনি বলেছেন। মতুয়া সমাজের বহু পরিবারের কাছে সরকারি পরিচয়পত্র ও বিভিন্ন শংসাপত্রের গুরুত্ব রয়েছে। শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই নথিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও এ দিনের বক্তব্যে উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসে সিএএ -এর শংসাপত্র পাওয়া ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা মুখ্যমন্ত্রী বলেন। তবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম ও যাচাই প্রক্রিয়াই কার্যকর থাকবে। সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, সিএএ-র শংসাপত্র পাওয়ার পর মতুয়া সমাজের যোগ্য মহিলারা যাতে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের সরকারি আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমা ও আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat) প্রকল্পের সুবিধা যাতে যোগ্য পরিবারগুলি পায়, সেদিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে আর্থিক সমস্যার কারণে কোনও পরিবার যাতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
এই কাজের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে একজন আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। মতুয়া সমাজের বিভিন্ন পরিবারের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আবেদনকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনকে নিতে হবে। নাগরিকত্বের শংসাপত্র, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবিমা ও আর্থিক সহায়তা সহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত, ঠাকুরনগরের এই সম্মেলন তাই শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকল না। মতুয়া সমাজের নাগরিকত্ব, উন্নয়ন ও সরকারি পরিষেবার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ এবং পৃথক পুরসভা গঠনের আশ্বাস স্থানীয় উন্নয়নের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সিএএ শংসাপত্র প্রদান ও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ঘোষিত সময়সীমা ঘিরেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন দেখার, মঞ্চ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি কত দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয় ও মতুয়া সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে তার সুফল কতটা পৌঁছয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, Chorebagan Stampede | চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলির পাশে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, ২৫ লক্ষের চেক ও চাকরির আশ্বাস ঘিরে রাজনৈতিক তরজা




