সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বারুইপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগণা ৩০ অক্টোবর ২০২৬ : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের উত্তেজনার পারদ চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের জনসভা থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Abhishek Banerjee) নিশানা করে একের পর এক আক্রমণ শানালেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লিতে গিয়ে রাজনীতি করার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি ভোটের ময়দানে পরাজিত করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূলের আর আগের মতো জায়গা নেই। আগামী পুরসভা নির্বাচনেও বিজেপির (BJP) জয় হবে বলে দাবি করেছেন তিনি। অন্য দিকে, শুভেন্দুর মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তাঁকে প্রতিহিংসাপরায়ণ বলে আক্রমণ করেছে তৃণমূল শিবির। ফলে বারুইপুরের সভাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী শিবিরের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে।

শুক্রবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের নিউ ইন্ডিয়ান মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে মমতার বয়স ও নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছিল। কয়েক দিন আগে তিনি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, প্রায় ৭৫ বছর বয়সে পৌঁছনো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর নির্বাচনে না দাঁড়ানোই ভাল। তাঁর এখন বিশ্রাম নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছিলেন বিরোধী দলনেতা। শুক্রবার সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি ফের রাজনৈতিক আক্রমণ করেন বলে উল্লেখ। শুভেন্দুর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যদি নির্বাচনে লড়ার ক্ষমতা থাকে, তা হলে তিনি ভোটে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু বিজেপি তাঁকে ফের পরাজিত করবে। উল্লেখ্য যে, এর পর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) মঞ্চের সমাবেশের প্রসঙ্গ তুলে মমতাকে কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়, ‘আপনি দিল্লি যান, পশ্চিমবঙ্গে আর কিছু হবে না।’ অর্থাৎ, বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব কমে গিয়েছে ও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় হওয়াই এখন উপযুক্ত বলে বোঝাতে চেয়েছেন বিরোধী দলনেতা। আগামী দিনে তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তি আরও কমবে বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত।
শুভেন্দুর এই মন্তব্যের পরেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তৃণমূল কংগ্রেস। দলের সাংসদ সৌগত রায় (Saugata Roy) বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে যাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত শুভেন্দু অধিকারীর কথায় নির্ধারিত হবে না। তাঁর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই রাজনৈতিক লড়াইয়ে বিশ্বাস করেন ও এখনও সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিরোধী নেতার কটাক্ষে তৃণমূল নেত্রীর রাজনৈতিক অবস্থান বদলাবে না বলেও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। ফলে মমতার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে বাক্যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। বারুইপুরের সভায় শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নিশানা করেন শুভেন্দু। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। শুভেন্দুর দাবি, অভিষেক যে আসনেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন না কেন, তাঁকে পরাজিত করার ক্ষমতা বিজেপির রয়েছে। এমনকি অভিষেকের আগের জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি ভোটে তাঁকে হারানোর চ্যালেঞ্জ করেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
অভিষেককে আক্রমণের ক্ষেত্রে বৃহস্পতিবারের একটি ঘটনাও টেনে আনেন শুভেন্দু। ওই দিন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে বিপাকে ফেলতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশ, বিভিন্ন সংস্থাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রায় ৩০টি মামলা বর্তমান বলে দাবি করেন অভিষেক। আরও মামলা হলেও তিনি পিছিয়ে যাবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। অভিষেকের অভিযোগ, গত ছয়-সাত বছর ধরে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে তাঁকে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে। তাঁকে গ্রেফতার করে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নিজের আপ্তসহায়কের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর দাবি, মিথ্যা মামলায় তাঁর আপ্তসহায়ককে প্রায় আড়াই মাস হেফাজতে থাকতে হয়েছে। এত কিছুর পরেও তিনি রাজনৈতিক লড়াই থেকে সরে দাঁড়াবেন না বলে জানিয়েছিলেন অভিষেক।
এই বক্তব্যের পরেই শুক্রবার বারুইপুরের সভা থেকে অভিষেককে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর মন্তব্য, ‘বড় চোরটা কবে জেলে যাবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।’ এর পর সরাসরি অভিষেকের নাম করে তাঁকে নির্বাচনে পরাজিত করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ভোটের লড়াইয়ে অভিষেকের জয়ের ব্যবধানকেও ছাপিয়ে যাওয়ার দাবি করে রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও উসকে দেন বিরোধী দলনেতা। যদিও শুভেন্দুর এই অভিযোগ ও কটাক্ষের পক্ষে সভায় কোনও নতুন নথি বা প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
অন্যদিকে, শুভেন্দুর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন সৌগত রায়। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি করেন। ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের বহু কর্মীকে জেলে পাঠানোর অভিযোগও তুলেছেন । সৌগতর দাবি, তৃণমূলের কয়েকশো কর্মীকে বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রাজ্যের মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করে বিরোধী নেতার বক্তব্যে বারবার জেল এবং শাস্তির প্রসঙ্গ উঠে আসছে বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যতই চাপ তৈরি করা হোক, তৃণমূল তার মোকাবিলা করবে। এদিনের সভায় বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচী ও আগামী পুরসভা নির্বাচন নিয়েও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, আগামী দিনে রাজ্যের পুরসভাগুলিতে বিজেপির প্রভাব আরও বাড়বে এবং নির্বাচনী ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। পুরসভা ভোটকে সামনে রেখে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তিনি সংগঠিত প্রচারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বিজেপির শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই ধরনের সভা করা হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়াও ভোট-পরবর্তী হিংসা, জমি দখল এবং স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তৃণমূলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সরব হন শুভেন্দু। ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির খান থেকে শুরু করে শওকত মোল্লার (Saokat Molla) মতো নেতাদের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় জমি দখল ও রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন বলে উল্লেখ। বারুইপুরের জনসভায় বামপন্থী দল ও তাদের সমর্থকদেরও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি শুভেন্দু অধিকারী। কয়েক দিন আগে কাকদ্বীপে আয়োজিত একটি সভার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, সেদিনই বারুইপুরে জনসভা করার ইচ্ছা হয়েছিল তাঁর। বামপন্থী শিবিরকে নিশানা করে আরশোলা ও ছারপোকার উপদ্রবের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তুলনা করে তিনি কটাক্ষ করেন। এই মন্তব্য ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মত। কারণ, রাজ্যের রাজনীতিতে তৃণমূল ও বিজেপির পাশাপাশি বামপন্থী দলগুলিও নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বারুইপুরের সভা থেকে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ জানানো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লি যাওয়ার পরামর্শ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্বাচনে হারানোর দাবি ও তৃণমূলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি, এসব মিলিয়ে সভার রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়েছে। অন্য দিকে, সৌগত রায়ের পাল্টা আক্রমণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির এই বক্তব্যকে সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয় তৃণমূলও। আগামী পুরসভা নির্বাচন ও রাজ্যের পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াই যত এগোবে, ততই দুই শিবিরের মধ্যে এই ধরনের বাক্যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :BRICS Summit | Modi Xi Jinping meeting, Xi Jinping India visit : গালওয়ানের পর প্রথম দিল্লিতে শি জিনপিং, মোদীর সঙ্গে বৈঠকে সীমান্ত-বাণিজ্য থেকে ব্রহ্মপুত্র, নজরে একাধিক বড় ইস্যু


