পালকি সিং, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ধনসম্পত্তি বৃদ্ধি, সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি কামনা এবং সুস্বাস্থ্য প্রার্থনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধনতেরসের (Dhanteras) ঐতিহ্য। দীপাবলির আগে এই বিশেষ তিথিকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। সোনা-রুপোর গয়না কেনা থেকে শুরু করে নতুন বাসনপত্র, মূল্যবান ধাতু কিংবা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পরিকল্পনা করেন বহু মানুষ। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই দিনটি সম্পদের দেবী লক্ষ্মী (Goddess Lakshmi) এবং আরোগ্যের দেবতা ধন্বন্তরির (Lord Dhanvantari) সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ধনতেরস আর্থিক মঙ্গল ও সুস্থ জীবন কামনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য। ২০২৬ সালে ধনতেরস কবে পালিত হবে, ত্রয়োদশী তিথি কখন শুরু হচ্ছে এবং কখন শেষ হচ্ছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পঞ্জিকা অনুসারে, ৬ নভেম্বর, শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশী তিথি। পরের দিন ৭ নভেম্বর, শনিবার সকালে এই তিথির অবসান হবে। তবে পঞ্জিকাভেদে তিথি শুরুর এবং শেষের সময়ে সামান্য পার্থক্য আছে।
ধনতেরস কথাটির মধ্যেই এই উৎসবের তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে। ‘ধন’ বলতে সম্পদ বা ঐশ্বর্যকে বোঝানো হয়। অন্য দিকে, ‘তেরস’ শব্দটি এসেছে ত্রয়োদশী থেকে। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকার কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। অনেক জায়গায় এটি ধনত্রয়োদশী (Dhantrayodashi) নামেও পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই দিনে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করলে সংসারে সমৃদ্ধি আসে ও অর্থনৈতিক বাধা কাটিয়ে ওঠার কামনা পূরণ হয়। একই সঙ্গে ধন্বন্তরির পুজোর মধ্য দিয়ে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও রোগমুক্ত জীবনের প্রার্থনা করা হয়। ফলে সম্পদ এবং স্বাস্থ্যের যুগল কামনাই ধনতেরসের মূল ভাবনা। ধনতেরসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমুদ্রমন্থনের পৌরাণিক কাহিনিও। পুরাণের বর্ণনা অনুসারে, অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে দেবতা ও অসুরেরা একসঙ্গে ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করেছিলেন। সেই মন্থন থেকে একে একে উঠে এসেছিল বহু মূল্যবান রত্ন ও ঐশ্বরিক সম্পদ। সেই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই আবির্ভূত হন দেবী লক্ষ্মী। অন্য দিকে, অমৃতপূর্ণ পাত্র হাতে আবির্ভূত হন দেবতাদের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ধন্বন্তরি। হিন্দু ধর্মীয় আখ্যান অনুযায়ী, ধন্বন্তরি আয়ুর্বেদ ও চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত দেবতা। তাঁর আবির্ভাবের স্মরণেই ধনতেরসের দিনে আরোগ্য কামনা করে পুজো করার রীতি প্রচলিত হয়েছে। দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে ধন্বন্তরির এই যোগ উৎসবটিকে আলাদা তাৎপর্য দিয়েছে। এক দিকে ধনসম্পদ, অন্য দিকে শরীর ও মনের সুস্থতা দুইয়েরই গুরুত্ব এই তিথিতে তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ধনতেরসের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পঞ্জিকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩২ মিনিটে ত্রয়োদশী তিথি শুরু হবে। এই তিথি শেষ হবে ৭ নভেম্বর, শনিবার সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে। বাংলা তারিখের হিসাবে পঞ্জিকাটিতে তিথি শুরুর দিন ২০ কার্তিক ও শেষের দিন ২১ কার্তিক উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই পঞ্জিকার হিসাব ধরলে ৬ নভেম্বর সকাল থেকে শুরু করে পরের দিন সকাল পর্যন্ত ত্রয়োদশী তিথি থাকবে।
অন্য দিকে, গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকায় ত্রয়োদশী তিথি শুরুর সময় দেওয়া হয়েছে ৬ নভেম্বর, শুক্রবার সকাল ১১টা ১ মিনিট ১৩ সেকেন্ড। তিথি শেষ হবে ৭ নভেম্বর, শনিবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে। এই পঞ্জিকায় বাংলা তারিখের হিসাবে তিথি শুরুর দিন ১৯ কার্তিক এবং শেষের দিন ২০ কার্তিক বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, দুই পঞ্জিকার মধ্যে তিথির সূচনা ও সমাপ্তির সময়ে কিছুটা ফারাক আছে। ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রচলিত রীতি এবং অনুসৃত পঞ্জিকার নির্দেশ মেনে চলার প্রবণতা দেখা যায়। তাই পুজোর নির্দিষ্ট সময় স্থির করার আগে নিজের ব্যবহৃত পঞ্জিকার হিসাব দেখে নেওয়া জরুরি। ধনতেরসের সঙ্গে কেনাকাটার সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। বহু পরিবারে এই দিন সোনা, রুপো, অলংকার, নতুন বাসন কিংবা ঘরোয়া ব্যবহারের সামগ্রী কেনার রীতি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই দিনে নতুন কিছু কিনলে সংসারে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির আগমন ঘটে। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই দীপাবলির আগে বাজারে কেনাকাটার ব্যস্ততা বাড়ে। গয়নার দোকান, বাসনপত্রের বিপণি ও বিভিন্ন খুচরো ব্যবসায় এই সময় ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা যায়। তবে কেনাকাটার ধরন একেক পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও নিজস্ব রীতির উপর নির্ভর করে। সোনা বা রুপো কেনা সম্ভব না হলেও অনেকে সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটখাটো কোনও জিনিস কেনেন। উৎসবের মূল উদ্দেশ্য যে কেবল দামি সামগ্রী কেনা নয়, বরং মঙ্গল কামনা ও পারিবারিক আনন্দের আবহ তৈরি করা, সেই কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
দীপাবলির উৎসবপর্বে ধনতেরসের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত দীপাবলির আগের দিনগুলিতে এই তিথি পালিত হয় ও ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, সাজানো ও পুজোর প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। অনেক বাড়িতে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং লক্ষ্মী ও ধন্বন্তরির উদ্দেশে পুজো নিবেদন করা হয়। অঞ্চলভেদে পুজোর পদ্ধতি, উপাচার এবং কেনাকাটার রীতিতে পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও ধাতব সামগ্রী কেনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, কোথাও আবার আরোগ্য ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই ধনতেরসের সাংস্কৃতিক পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। আবার, ধন্বন্তরির সঙ্গে এই তিথির সম্পর্কের কারণে স্বাস্থ্যকেও উৎসবের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি সুস্থ শরীর যে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রয়োজন, সেই ভাবনাই ধনতেরসের ধর্মীয় তাৎপর্যের একটি অংশ। তাই অনেকে এই দিনে পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা কামনা করেন। একই সঙ্গে নতুন বছরের আর্থিক পরিকল্পনা, সংসারের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয় নিয়েও অনেকে ভাবনাচিন্তা করেন। যদিও বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাখ্যা পরিবার ও অঞ্চল অনুযায়ী বদলাতে পারে, তবু ধনতেরসকে ঘিরে আর্থিক মঙ্গল এবং আরোগ্যের কামনা বহুল প্রচলিত।
২০২৬ সালের ধনতেরস উপলক্ষে যাঁরা পুজোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ত্রয়োদশী তিথির সময়সীমা সম্পর্কে ধারণা রাখা। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে, তিথি শুরু হচ্ছে ৬ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩২ মিনিটে এবং শেষ হচ্ছে ৭ নভেম্বর সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসারে, শুরু ৬ নভেম্বর সকাল ১১টা ১ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে ও শেষ ৭ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে। দুই পঞ্জিকার সময়ের পার্থক্য মাথায় রেখে পুজো ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে ত্রয়োদশী তিথির সময়সীমা জানার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পুজোর শুভ মুহূর্ত জানতে সংশ্লিষ্ট পঞ্জিকার নির্দেশ দেখা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ধনতেরসের প্রধান দিন হিসেবে ৬ নভেম্বর, শুক্রবারকে ঘিরেই প্রস্তুতি চলবে। পরের দিন ৭ নভেম্বর, শনিবার সকালে ত্রয়োদশী তিথি শেষ হবে। দেবী লক্ষ্মীর কাছে সমৃদ্ধি এবং ধন্বন্তরির কাছে আরোগ্য কামনার এই উৎসবে ধর্মীয় আচার, পারিবারিক ঐতিহ্য ও কেনাকাটার রীতি একসঙ্গে জায়গা করে নেয়। পঞ্জিকাভেদে সময়ের সামান্য পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবেই ত্রয়োদশী তিথি ৬ নভেম্বর শুরু হয়ে ৭ নভেম্বর সকালে শেষ হচ্ছে। ফলে ধনতেরসের পুজো, কেনাকাটা এবং পারিবারিক আয়োজনের পরিকল্পনা করার আগে নিজের অনুসৃত পঞ্জিকার সময় দেখে নেওয়াই হবে সবচেয়ে ভাল উপায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Suvendu Adhikari on POCSO case for minor marriage | ১৮-র আগে মা হলে স্বামীর বিরুদ্ধে POCSO মামলা! বাল্যবিবাহ রুখতে বড় অভিযানের হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর



