সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে দুই পৃথক পুলিশি গুলিচালনার ঘটনায় দুই অভিযুক্তের মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত এক যুবকের মৃত্যুর পর এবার মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানেও পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর খবর খুনের মামলায় ধৃত সামাউন শেখ (Samaun Sheikh) নামে এক আসামীর। দুই ঘটনাতেই পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন ও পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পাল্টা গুলিতে তাঁদের মৃত্যু হয়।
মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে সুজিত মণ্ডল (Sujit Mondal) খুনের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন সামাউন। মঙ্গলবার তাঁকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল পুলিশ। সামশেরগঞ্জ থানার পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় সুজিতকে যেখানে খুন করা হয়েছিল, সেই জায়গাতেই নিয়ে যাওয়া হয় অভিযুক্তকে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার বিবরণ যাচাই করার সময়ই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে পুলিশের দাবি। অভিযোগ, একজন পুলিশকর্মীর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন সামাউন। এর পর পুলিশকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালান বলেও অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে জখম হন তিনি। পরে তাঁকে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট নাগাদ ঘটনার পুনর্নির্মাণ চলাকালীন এই গোলমালের সূত্রপাত। তদন্তকারী দলের সদস্যদের সঙ্গে অভিযুক্তের ধস্তাধস্তি হয় বলে উল্লেখ। সেই সময়ই আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া ও গুলি চালানোর অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনাস্থলে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কী ভাবে গুলি চলেছিল এবং কত দূরত্ব থেকে গুলি চালানো হয়েছিল, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আসবে বলে উল্লেখ। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তের গুলিচালনার পর আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়।
জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার একজন আধিকারিক জানিয়েছেন, সুজিত মণ্ডল খুনের ঘটনার তদন্ত করছিল রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি (CID)। মঙ্গলবার সেই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই সামাউনকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই আধিকারিকের বক্তব্য, ‘ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় গুলি চলার ঘটনা ঘটে। তার পর অভিযুক্তকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’ তদন্তকারী সংস্থার তরফে পরবর্তী সময়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হলে ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত সামনে আসবে বলে মত ওয়কিবহাল মহলের।
সামাউনের মৃত্যুর পিছনে যে খুনের মামলাটি আছে, সেটিও এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে। গত ২৮ আগস্ট সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকার বাসিন্দা সুজিত মণ্ডল রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের সদস্যেরা তাঁর খোঁজ শুরু করেন। পরে তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সুজিতের নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের তরফে পুলিশের কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ। সুজিতের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল অভিযোগ করেছিলেন, স্বামীর খোঁজে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে বার বার আবেদন জানিয়েও তিনি প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। বিষয়টি সামনে আসার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজ্য প্রশাসনের তরফেও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই ঘটনায় পুলিশের কাজে বড় ধরনের ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছিলেন বলে সূত্রের খবর। তাঁর বক্তব্যে সুজিতের হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার পাশাপাশি তদন্ত ও পুলিশি তৎপরতার ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল।
সুজিতের দেহ উদ্ধারের পর খুনের অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের নাম সামিউল শেখ (Samiul Sheikh), তাজকিরা বিবি (Tajkira Bibi) ও জনি শেখ (Jani Sheikh)। তাঁদের বিরুদ্ধে সুজিতকে খুনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছিল প্রশাসন। ওই মামলার তদন্ত এগিয়ে চলার মধ্যেই ধৃতদের অন্যতম সামাউনের মৃত্যু নতুন পরিস্থিতি তৈরি করল। এখন তদন্তের ক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যুর প্রভাব কী হবে, বাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী কী তথ্য রয়েছে ও মামলার অন্যান্য প্রমাণ কী অবস্থায় রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, সুজিত খুনের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পর একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপও করা হয়েছিল। ধুলিয়ান টিওপির দায়িত্বে থাকা এএসআই সুমন্তকুমার দাস (Sumanta Kumar Das) ও সামশেরগঞ্জ থানার দ্বিতীয় আধিকারিক এসআই সাইফুল আলমকে (Saiful Alam) সাসপেন্ড করা হয়। সামশেরগঞ্জ থানার আইসি সুব্রত ঘোষকে (Subrata Ghosh) লাইনে ক্লোজ় করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফরাক্কার এসডিপিও শেখ শামসুদ্দিনকেও (Sheikh Shamsuddin) শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। পাশাপাশি জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর সিংহকে (Surinder Singh) স্বরাষ্ট্র দফতরের তরফে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছিল বলে সূত্রের খবর। এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে সুজিত নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
সেই মামলার অন্যতম অভিযুক্তের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা তাই নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে। ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তকে কত জন পুলিশকর্মী পাহারা দিচ্ছিলেন, অস্ত্রের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল ও অভিযুক্তের পালানোর চেষ্টা নিয়ে পুলিশের কাছে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে গুলিচালনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকর্মীদের বক্তব্য, ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্য ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও ঘটনার প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করবে।
মঙ্গলবারের এই ঘটনা আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। একই দিনে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত এক যুবকেরও পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে। সেখানেও পুলিশের বক্তব্য, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্ত আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন ও তিন রাউন্ড গুলি চালান। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তাঁর শরীরে তিনটি গুলি লাগে ও পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজ্যের দুই পৃথক জেলায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাগুলি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু, গাইঘাটা ও ধুলিয়ানের ঘটনা দুটি পৃথক মামলার সঙ্গে যুক্ত। গাইঘাটার ঘটনাটি ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে, আর ধুলিয়ানের ঘটনাটি সুজিত মণ্ডল খুনের তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি, প্রমাণ ও তদন্তের ফল আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেবল একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে বলেই দুই ঘটনার সব দিক এক বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সামাউনের মৃত্যুর পর সুজিত মণ্ডল খুনের মামলার তদন্ত কোন পথে এগোয়, এখন সেদিকেই সকলের লক্ষ্য থাকবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের তথ্য ও তদন্তকারী সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তিতে মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে সুজিতের পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি ও তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলিরও নিষ্পত্তি জরুরি। অভিযুক্তের মৃত্যুতে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শেষ হলেও পুরো ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন ও আইনি প্রক্রিয়ায় বাকি অভিযোগগুলির বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান বিষয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : 1400 Fire Department Vacancies in West Bengal | CM Suvendu Adhikari : দমকল দফতরে কর্মী ঘাটতি মেটাতে বড় সিদ্ধান্ত, ১৪০০ পদে নিয়োগের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর



