সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গাইঘাটা, উত্তর চব্বিশ পরগণা। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ : পুত্রের মৃত্যুতে মায়ের চোখে জল, অথচ সেই মৃত্যুর পিছনে থাকা পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন বাবার। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় (Gaighata) ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের (Prahlad Das) মৃত্যু ঘিরে এমনই বিপরীত প্রতিক্রিয়া সামনে এল। এক দিকে সন্তান হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা, অন্য দিকে অভিযুক্তের শাস্তি পাওয়াকে স্বাগত জানানোর মনোভাব। চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালের সামনে মঙ্গলবারের এই ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। প্রহ্লাদের মায়ের কথায়, ‘মা হিসেবে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে খুশি।’ অন্য দিকে তাঁর বাবার বক্তব্য, পুলিশ যা করেছে, ঠিকই করেছে। তবে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রহ্লাদের মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এবং পুলিশের দাবি যাচাইয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন প্রহ্লাদের বাবা-মা। তাঁদের ছেলে সেখানে মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে পুলিশকর্মীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরে দুপুর দেড়টা নাগাদ যখন পুলিশ প্রহ্লাদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে, তখনই পরিস্থিতি আবেগঘন হয়ে ওঠে। ছেলের দেহ সামনে আসতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মা। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার কথা একবারও ভাবলি না! এ কী অন্যায় করলি বাবা!’ কিছুক্ষণের মধ্যেই শোক সামলাতে না পেরে হাসপাতালের বিছানায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। অথচ এই মায়ের মুখেই শোনা গেল অভিযুক্ত ছেলের শাস্তি পাওয়ার পক্ষে বক্তব্য। তাঁর দাবি, ধর্ষণ ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগে ছেলে গ্রেফতার হওয়ার পরে তিনি চেয়েছিলেন, আইন অনুযায়ী তার কঠোর শাস্তি হোক। কিন্তু পুলিশের গুলিতে ছেলের মৃত্যু হবে, এমনটা তিনি চাননি। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছিল, প্রহ্লাদ পালানোর চেষ্টা করছিল ও সেই সময় গুলি চালায়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, প্রহ্লাদ এক পুলিশকর্মীর রিভলভার কেড়ে নিয়ে তিন রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল। তার পর পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। সেই গুলিতে প্রহ্লাদের বাঁ পা ও বুকে আঘাত লাগে। মোট তিনটি গুলি লেগেছিল বলে জানা গিয়েছে। পরে তাকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এই বিবরণ পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে; ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রহ্লাদের মা জানিয়েছেন, ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তাঁর কথায়, ‘আমার ছেলে খুন-ধর্ষণের মতো অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আমি তো নিজের হাতে কোনও প্রমাণ পাইনি।’ তাঁর বক্তব্যে এক দিকে ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সংশয়, অন্য দিকে অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির দাবি, দুই মনোভাবই উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে তো পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওর কঠোর শাস্তি হোক চেয়েছিলাম। কিন্তু এনকাউন্টার চাইনি।’
পুলিশের দাবি নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন প্রহ্লাদের মা। তাঁর বক্তব্য, এত পুলিশকর্মীর পাহারা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ছেলে পালানোর চেষ্টা করল, তা তাঁর কাছে বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, ‘বলল পালাচ্ছিল। এত গার্ড থাকতে কীভাবে পালাচ্ছিল ও? পালাচ্ছিল নাকি! গুলি করেছে… যাক।’ কথাগুলি বলতে বলতে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। নিজের সন্তানকে হারানোর শোক এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের অভিঘাত যেন একসঙ্গে তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
তবে মায়ের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক উঠে আসে যখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত শোকের বাইরে গিয়ে সমাজের কথা বলেন। তাঁর কথায়, ‘মা হিসেবে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে খুশি। আমার মেয়ের সঙ্গে এমন হলে তখন তো আমি শাস্তিই চাইতাম।’ এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে তিনি ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তাঁর আবেদন, ভবিষ্যতে যেন আর কেউ এমন অপরাধ না করে এবং কারও পরিবারকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। তিনি বলেন, ‘আশা করব, আর কেউ যেন ঘৃণ্য কাজ না করে। ওর মতো কাউকে চলে যেতে না হয়।’ বক্তব্য শেষ হওয়ার পরেও শোক সামলাতে পারেননি তিনি। ফের জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে যান। প্রহ্লাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ছিল সাধারণ। বৈকুণ্ঠপুর বাজারে তাঁদের দু’টি সেলুন ছিল বলে উল্লেখ। বাবা ও ছেলে দু’জনেই সেখানে কাজ করতেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এই যুবকের বিরুদ্ধে এলাকার একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই রবিবার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পরে আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছিল পুলিশ।
সোমবার গভীর রাতে সেই কাজের জন্য প্রহ্লাদকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে পুলিশের দাবি। সেই সময়ই পালানোর চেষ্টা ও অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালানোর অভিযোগ সামনে আসে। পুলিশের পাল্টা গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে এমন ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের শিকার কিশোরীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং তদন্তের প্রতিটি ধাপ আইন মেনে পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলবার হাসপাতালে প্রহ্লাদের বাবা যখন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হন, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু কঠোর। ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘উপযুক্ত কাজ হয়েছে। বিশাল খুশি হয়েছি আমি। আর কিছু?’ পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করে তাঁর এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাধারণত সন্তানের মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের শোকই সামনে আসে। কিন্তু এই ঘটনায় বাবার বক্তব্যে ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রতি ক্ষোভ এবং শাস্তির প্রতি সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে।
প্রহ্লাদের মা-বাবার প্রতিক্রিয়া একই পরিবারের মধ্যে তৈরি হওয়া দুই ভিন্ন অনুভূতির ছবি তুলে ধরেছে। মা সন্তান হারানোর যন্ত্রণা অস্বীকার করতে পারছেন না, আবার অভিযুক্তের শাস্তির প্রয়োজনীয়তাও মানছেন। বাবা পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক ক্ষোভের প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়ার উপরেও নির্ভর করতে হবে। চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে প্রহ্লাদের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বারাসত মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ তাঁর বাবাকেও গাড়িতে ওঠার কথা বলে। দেহ ময়নাতদন্তের পরে মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে আসলে, পুলিশের তদন্ত ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার বিভিন্ন দিক বিচার করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ।
এই ঘটনায় এক দিকে রয়েছে এক কিশোরীর উপর ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ, অন্য দিকে অভিযুক্তের মৃত্যুকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। প্রহ্লাদের বাবা-মায়ের বক্তব্য সেই দুই দিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সন্তানকে হারিয়েও মা যখন বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে খুশি’, তখন তাঁর কথায় অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেমন ধরা পড়ে, তেমনই ছেলের মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকেও যায়। আর বাবার বক্তব্য দেখায়, অভিযোগের গুরুত্ব তাঁর কাছে সন্তানের মৃত্যুশোকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনার সমস্ত দিক নির্ভরযোগ্য তদন্তে উঠে আসা এবং নির্যাতিতার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



