সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পৃথিবীর দুই প্রান্তে একসঙ্গে চলছে ভয়াবহ সংঘাত। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা, ইজ়রায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সংঘাতের সরাসরি অংশীদার নয়, এমন বহু দেশের মানুষকেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা উচিত নয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান খোঁজার আহ্বান জানালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)। তাঁর বক্তব্য, সংঘাত বন্ধ করতে ভারত নিজের মতো করে উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করতে প্রস্তুত নতুন দিল্লি।
রবিবার রাষ্ট্রপুঞ্জ দিবস উপলক্ষ্যে দিল্লিতে আয়োজিত চিন্ময় অমৃত মহোৎসব আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, বর্তমানে বিশ্ব যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সংঘাত থামানোর দায়িত্ব কেবল সংঘাতে জড়িত দেশগুলির উপর ছেড়ে দিলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও সক্রিয় হতে হবে। কারণ, সংঘাতের অভিঘাত নির্দিষ্ট কোনও ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহণ, খাদ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর তার প্রভাব পড়ে বহু দূরের দেশেও। বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ, ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ না থাকা মানুষও নানা ভাবে তার মূল্য চোকাচ্ছেন। সংঘাতের জেরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলে। পণ্য পরিবহণে সমস্যা দেখা দিলে সরবরাহের খরচ বাড়ে, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় ও তার প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের সংসারে। ফলে সংঘাতকে কেবল দুই বা কয়েকটি দেশের সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে তার বৃহত্তর প্রভাব অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
জয়শঙ্কর বলেন, ‘পৃথিবীতে বর্তমানে দুটো বড় সংঘাত চলছে। একটা ইউক্রেনে, অন্যটা পশ্চিম এশিয়ায়। এর ফল ভুগতে হচ্ছে তাঁদের, সংঘাতের সঙ্গে দূরদূরান্ত পর্যন্ত যাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই। যাঁদের এখানে কিছুই করার নেই, তাঁরাই সংঘাতের মূল্য চোকাচ্ছেন।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সংঘাতের মানবিক ও অর্থনৈতিক দিকটির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের ক্ষতি শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু দেশের মানুষের জীবনে। ভারতের বিদেশমন্ত্রীর মতে, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অসহায় দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে যথাযথ নয়। সংঘাতের অবসান ঘটাতে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। সেই উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকতে হবে আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সাময়িক সুবিধা অর্জন করা গেলেও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। ভারত বরাবরই এই অবস্থানের পক্ষে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
জয়শঙ্করের কথায়, ‘আমরা অসহায় দর্শক হয়ে থাকতে পারি না। ভারত সবসময় আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে নেওয়ার পক্ষপাতী। আমাদের এই আবেদনের মাধ্যমে বিশ্বজনীন মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটে।’ তাঁর এই মন্তব্যে ভারতের বিদেশনীতি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উপর জোর দিতে চায়। একই সঙ্গে সংঘাত থামানোর প্রচেষ্টায় অন্য দেশগুলির সঙ্গে সহযোগিতার দরজাও খোলা রাখতে আগ্রহী ভারত।
তবে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো ও বাস্তবে সংঘাতের অবসান ঘটানো এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কঠিন হয়ে ওঠে। ইউক্রেন সংঘাতের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের অবসান নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নানা আলোচনা চলেছে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও একই ভাবে জটিল, যেখানে একাধিক দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আলোচনায় বসার সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ঠিক কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত কর্মসূচী প্রকাশ করেননি বিদেশমন্ত্রী। তবে সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে নয়াদিল্লি নিজেদের মতো করে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। অন্য দেশের সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করার ক্ষেত্রেও ভারতের আপত্তি নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সংঘাতের সমাধানে একক উদ্যোগের পাশাপাশি বহুপাক্ষিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। যদিও ভারতের প্রচেষ্টার প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগের পরিধি কিংবা সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট তথ্য উঠে আসেনি। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আমেরিকা, ইজ়রায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব একাধিক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। সৌদি আরবের দিকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এবং হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার মতো বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এই অঞ্চলে চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে আমদানি-নির্ভর দেশগুলির অর্থনীতিতেও।
এরই মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইরানে নতুন করে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে উল্লেখ। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই সংঘাতের বিস্তার রোধ করা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থামানোর প্রচেষ্টায় পাকিস্তানও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে ইসলামাবাদ একাধিক আলোচনার আয়োজন করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, নতুন দিল্লিও সংঘাত নিরসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চাইছে। তবে পাকিস্তানের উদ্যোগের সঙ্গে ভারতের প্রচেষ্টার কোনও সরাসরি সমন্বয় রয়েছে কি না, কিংবা দুই দেশ একই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জয়শঙ্কর নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি।
ভারতের কাছে এই দুই সংঘাতের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া-ইউক্রেন এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার উপর পড়তে পারে। বিশেষত পশ্চিম এশিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করেন। ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সচল রাখাও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু, ভারত কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা জানালেও সংঘাত থামানোর ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলির অবস্থান এবং আলোচনার সুযোগের উপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলি আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখাবে। সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কাও তত বাড়বে।
দুই সংঘাতের আবহে ভারতের অবস্থান জানিয়ে জয়শঙ্কর মূলত আলোচনার পথ খোলা রাখার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সংঘাতের পরিণতি থেকে বিশ্বের কোনও দেশই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তাই পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এখন দেখার, আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা গতি পায় ও পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থামানোর পথে বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Indonesia visit, Modi Jakarta arrival | জাকার্তায় পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী , প্রাবোওর উষ্ণ অভ্যর্থনা, তিন দেশের সফরে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে নতুন গতি



