সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : এক দিনের ক্রিকেটে রানের বন্যা, একের পর এক বাউন্ডারি ও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টানটান লড়াই এসব মিলিয়ে ইংল্যান্ড (England) ও শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) ম্যাচটি জায়গা করে নিল ক্রিকেটের স্মরণীয় লড়াইগুলির তালিকায়। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে (Rawalpindi) ত্রিদেশীয় এক দিনের সিরিজ়ের এই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ৪২৯ রান তুলেছিল ইংল্যান্ড। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের (Harry Brook) ব্যাট থেকে এসেছিল দুরন্ত দ্বিশতরান। কিন্তু এত বড় রানও শেষ পর্যন্ত জয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি ইংরেজদের। জবাবে ব্যাট করতে নেমে এক বল বাকি থাকতে আট উইকেট হারিয়ে ৪৩০ রান তুলে জয় ছিনিয়ে নেয় শ্রীলঙ্কা। এই অবিশ্বাস্য রান তাড়ার সঙ্গে তৈরি হয়েছে একাধিক নজির। দু’দলের ব্যাটারদের দাপটে ম্যাচে এসেছে ৯৩টি চার ও ৩০টি ছক্কা। বাউন্ডারি থেকেই উঠেছে মোট ৫৫২ রান। অন্য দিকে, ২০২ রানের ইনিংস খেলেও দলকে জেতাতে না পারায় হতাশার এক নজিরের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল ব্রুকের নাম।
ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে ছিল আক্রমণাত্মক মেজাজ। নির্ধারিত ৫০ ওভারের মধ্যে চার উইকেট হারিয়ে ৪২৯ রান তোলে তারা। অধিনায়ক ব্রুকের ব্যাটিং ছিল ইনিংসের অন্যতম আকর্ষণ। মাত্র ১১৬ বলে ২০২ রান করেন তিনি। বড় শট খেলার পাশাপাশি ইনিংসের গতি ধরে রেখে শ্রীলঙ্কার বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তাঁর এই দ্বিশতরান ইংল্যান্ডকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে দেয়। সাধারণত চারশোর কাছাকাছি রান তুলতে পারলে এক দিনের ক্রিকেটে জয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট বেড়ে যায়। কিন্তু এই ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা যে ভাবে পাল্টা আক্রমণ করেছেন, তাতে ইংল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহও শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হয়নি। ৪৩০ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই রান তোলার গতি বজায় রাখে শ্রীলঙ্কা। ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর চাপ বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের শেষ ভাগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় তারা। ৪৯.৫ ওভারে আট উইকেট হারিয়ে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয় শ্রীলঙ্কা। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল রান তাড়ার ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নজির। এর আগে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) কীর্তি। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার (Australia) বিরুদ্ধে ৪৩৫ রান তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর এ বার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল শ্রীলঙ্কার ৪৩০ রানের সাফল্য।
শ্রীলঙ্কার এই জয় ভারতের (India) সাম্প্রতিক একদিনের ক্রিকেটের একটি নজিরকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। কয়েক দিন আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) বিরুদ্ধে ৪০৬ রান তাড়া করে জিতেছিল ভারত। সেই ম্যাচে শুভমন গিলের (Shubman Gill) নেতৃত্বাধীন দলের সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডির ম্যাচে শ্রীলঙ্কা আরও বড় লক্ষ্য অতিক্রম করে দেখিয়ে দিল, আধুনিক এক দিনের ক্রিকেটে চারশোর বেশি রান তোলার পরেও প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ব্যাটারদের আক্রমণাত্মক মনোভাব ও শেষ পর্যন্ত রান তোলার ক্ষমতা এই ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিয়েছে। ম্যাচটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল চার মারার সংখ্যায় নতুন রেকর্ড। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা দু’দল মিলিয়ে মোট ৯৩টি চার মেরেছেন। প্রতিটি চার থেকে চার রান ধরে হিসাব করলে বাউন্ডারি পার করে এসেছে ৩৭২ রান। এর আগে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও ম্যাচে এতগুলি চার দেখা যায়নি। পূর্ববর্তী নজিরটি ছিল ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে। সেই লড়াইয়ে দুই দলের ব্যাটাররা মোট ৮৭টি চার মেরেছিলেন। দীর্ঘ দিন ধরে টিকে থাকা সেই রেকর্ড এ বার ভেঙে দিল ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কার রানবহুল ম্যাচ।
শুধু চার নয়, ছক্কার সংখ্যাতেও দর্শকদের জন্য ছিল দারুণ রোমাঞ্চ। দুই দল মিলিয়ে ম্যাচে ছক্কা হয়েছে ৩০টি। ছয় থেকে এসেছে ১৮০ রান। চার ও ছক্কা মিলিয়ে মোট বাউন্ডারির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৩। এই হিসাবেই ম্যাচটি এক দিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ৯৩টি চার থেকে ৩৭২ রান ও ৩০টি ছক্কা থেকে ১৮০ রান, দুইয়ে মিলে বাউন্ডারি থেকেই এসেছে ৫৫২ রান। অর্থাৎ, ব্যাটারদের মোট রান সংগ্রহের বড় অংশই এসেছে সরাসরি সীমানা পার করে। এত বেশি বাউন্ডারির নজির এক দিনের ক্রিকেটে আগে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চার ও ছক্কা থেকে সর্বাধিক রান ওঠার ক্ষেত্রেও এই ম্যাচ নতুন রেকর্ড গড়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে সেন্ট জর্জে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ও ইংল্যান্ডের ম্যাচে দুই দলের ব্যাটাররা চার থেকে ২৫৬ এবং ছয় থেকে ২৭৬ রান করেছিলেন। বাউন্ডারি থেকে এসেছিল ৫৩২ রান। রাওয়ালপিন্ডির ম্যাচে সেই হিসাব ছাপিয়ে গিয়েছে। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা চার-ছয় মিলিয়ে তুলেছেন ৫৫২ রান। অর্থাৎ, আগের নজিরের তুলনায় আরও ২০ রান বেশি এসেছে বাউন্ডারি থেকে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, ম্যাচটিতে ব্যাটারদের আক্রমণ কতটা তীব্র ছিল।
দু’দলের মোট রানসংখ্যাও একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। ইংল্যান্ডের ৪২৯ এবং শ্রীলঙ্কার ৪৩০, দুই ইনিংস মিলিয়ে উঠেছে ৮৫৯ রান। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও ম্যাচে দুই দলের মিলিত রানসংগ্রহের নিরিখে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচটি। সেই ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে তুলেছিল ৮৭২ রান। রাওয়ালপিন্ডিতে ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কার লড়াইয়ে সেই নজির অক্ষত থাকলেও তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছে ২০০৯ সালে রাজকোটে ভারত ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচ। ওই ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে করেছিল ৮২৫ রান। রানসংখ্যার দিক থেকে ম্যাচটি যতই স্মরণীয় হোক, ইংল্যান্ড অধিনায়ক ব্রুকের কাছে ফলাফল ছিল হতাশার। তাঁর ২০২ রানের ইনিংস একদিনের ক্রিকেটে অধিনায়কোচিত ব্যাটিংয়ের দারুণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু দল জিততে না পারায় ব্যক্তিগত সাফল্যের আনন্দ ম্লান হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ম্যাচের আগে এক দিনের ক্রিকেটে কোনও ব্যাটার দ্বিশতরান করার পরেও তাঁর দল হেরে যাওয়ার নজির ছিল না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ব্রুকের ইনিংসের পর ইংল্যান্ডের হার তাই তৈরি করেছে নতুন এক পরিসংখ্যান, যা কোনও ব্যাটারের পক্ষে নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
এর আগে বড় ব্যক্তিগত ইনিংস খেলার পরও দলকে জেতাতে না পারার রেকর্ড ছিল জিম্বাবোয়ের (Zimbabwe) চার্লস কভেন্ট্রির (Charles Coventry) দখলে। ২০০৯ সালে বুলাওয়েতে বাংলাদেশের (Bangladesh) বিরুদ্ধে অপরাজিত ১৯৪ রান করেছিলেন তিনি। কিন্তু কভেন্ট্রির সেই অসাধারণ ইনিংসও জিম্বাবোয়েকে জয় এনে দিতে পারেনি। এত দিন সেই ঘটনাই বড় ব্যক্তিগত ইনিংসের পরাজয়ের আলোচনায় উঠে আসত। এ বার ব্রুকের দ্বিশতরানের পর ইংল্যান্ডের হার সেই প্রসঙ্গকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে ব্রুকের ২০২ রান এবং কভেন্ট্রির ১৯৪ রানের পরিস্থিতি এক নয়। দু’টি ম্যাচের ফল ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও ব্যক্তিগত কৃতিত্বের পরও দল হেরে যাওয়ার বিষয়টি দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্র। রাওয়ালপিন্ডির এই ম্যাচ দেখিয়ে দিল, আধুনিক এক দিনের ক্রিকেটে বড় রান করাই জয়ের শেষ কথা নয়। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং শক্তি, উইকেট হাতে রেখে রান তোলার পরিকল্পনা ও শেষ ওভার পর্যন্ত চাপ সামলানোর দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ড ৪২৯ রান করেও জিততে পারেনি, আর শ্রীলঙ্কা লক্ষ্য থেকে মাত্র এক রান দূরে থাকা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গিয়ে জয় নিশ্চিত করেছে। রেকর্ডসংখ্যক চার-ছক্কা, ৮৫৯ রানের সম্মিলিত সংগ্রহ, সফল রান তাড়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড ও ব্রুকের দ্বিশতরানের পরও হার মিলিয়ে ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কার এই ম্যাচ এক দিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘ দিন আলোচনায় থাকার মতো একটি লড়াই হয়ে রইল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vijay Deverakonda Rashmika Mandanna Wedding Proposal | ইতালিতে রশ্মিকাকে কেন বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারেননি বিজয় দেবরকোন্ডা? জানালেন অজানা কাহিনি



