সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিয়ে, সংসার ও সন্তানধারণের পরিকল্পনা জীবনের এই পরিচিত ছক বদলাচ্ছে দ্রুত। পড়াশোনা, পেশাগত ব্যস্ততা, আর্থিক স্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে অনেক দম্পতিই তুলনামূলক বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অন্য দিকে, অনিয়মিত জীবনযাপন, স্থূলত্ব, মানসিক চাপ এবং হরমোনজনিত নানা সমস্যাও প্রজননস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সন্তানধারণে দেরি হলে অনেকের মনে প্রথমেই আসে আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (In Vitro Fertilisation বা IVF) পদ্ধতির কথা। তবে সন্তানধারণের সমস্যা হলেই কি আইভিএফ করানো প্রয়োজন?
চিকিৎসার এই পদ্ধতি কি সব দম্পতির জন্য প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত? চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনায় উঠে আসছে, বন্ধ্যাত্ব ছাড়াও বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণমান, হরমোনের ভারসাম্য আর নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে প্রজনন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দম্পতির শারীরিক অবস্থা ও পরীক্ষার ফলের ওপর। আইভিএফের ক্ষেত্রে মহিলার ডিম্বাণু আর পুরুষের শুক্রাণুকে শরীরের বাইরে পরীক্ষাগারে নিষিক্ত করা হয়। তার পর তৈরি হওয়া ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। স্বাভাবিক উপায়ে নিষেক বা গর্ভধারণে বাধা থাকলে এই পদ্ধতি সন্তানধারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আইভিএফের সঙ্গে জড়িত চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা এবং ভ্রূণ স্থানান্তরের প্রতিটি ধাপই পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এই চিকিৎসা সফল হবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই শুধু অন্য কারও অভিজ্ঞতা শুনে কিংবা দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় আইভিএফের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রথমে সমস্যার কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি।
সন্তানধারণের ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহিলারা জন্মের সময় থেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে ও গুণমানেও পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর প্রজননক্ষমতা কমার প্রবণতা বাড়তে থাকে, ৪০ বছর পেরলে এই পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুরুষের ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে শুক্রাণুর কিছু বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে বয়সের প্রভাব এক রকম নয়। বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে তাই আগে থেকেই প্রজননস্বাস্থ্য মূল্যায়ন করানো উপকারী হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আইভিএফের মাধ্যমে গর্ভধারণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হলেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনাও বদলায়। ফলে বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে বলেই প্রত্যেক দম্পতিকে আইভিএফ করাতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।
আরও পড়ুন : Convergence of India’s Rich Classical Dance Forms at the Indraprastha Dance Festival
প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আর একটি বিষয় হল ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স (Insulin Resistance)। সাধারণত ইনসুলিন হরমোন রক্তের গ্লুকোজ়কে শরীরের কোষে প্রবেশ করে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া না দিলে অগ্ন্যাশয়কে আরও বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হতে পারে। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চললে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। স্থূলত্ব, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং কিছু বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্সের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু মহিলার ক্ষেত্রে এর সঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (Polycystic Ovary Syndrome বা PCOS)-এর যোগ থাকতে পারে। এই অবস্থায় ডিম্বাণু নিঃসরণ অনিয়মিত হওয়ায় সন্তানধারণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। তবে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স রয়েছে মানেই আইভিএফ প্রয়োজন, এমন নয়। খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব। মানসিক চাপও প্রজননস্বাস্থ্যের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, ঘুমের অভাব এবং মানসিক ক্লান্তি দৈনন্দিন জীবন ও শারীরিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে মস্তিষ্ক, ডিম্বাশয় ও প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন অংশের যোগাযোগ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে কারও কারও ঋতুচক্রে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে মানসিক চাপই বন্ধ্যাত্বের একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। প্রজননক্ষমতার উপর একাধিক শারীরিক, হরমোনজনিত আর জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয় একসঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানধারণে সমস্যা দেখা দিলে তাই শুধু মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা সংক্রান্ত মূল্যায়নও জরুরি।
মহিলাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা, জরায়ুর ফাইব্রয়েড (Fibroid), এন্ডোমেট্রিয়োসিস (Endometriosis) ও পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের মতো অবস্থাও সন্তানধারণে বাধা তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিটি রোগের প্রভাব এক নয়। জরায়ুর ফাইব্রয়েডের অবস্থান ও আকার, এন্ডোমেট্রিয়োসিসের তীব্রতা ও ডিম্বাণু নিঃসরণের পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন বদলায়। থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলেও ঋতুচক্র আর গর্ভধারণের উপর প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মূল সমস্যার চিকিৎসা করেই সন্তানধারণের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। আবার কিছু পরিস্থিতিতে প্রজনন চিকিৎসার সহায়তা প্রয়োজন হয়। তাই রোগের নাম শুনেই আইভিএফের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে রোগের মাত্রা ও প্রজননস্বাস্থ্যের সামগ্রিক অবস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, চলনক্ষমতা কম থাকা কিংবা শুক্রাণুর গঠনে অস্বাভাবিকতার কারণে নিষেকের সমস্যা হতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু নিঃসরণে বাধা, ফ্যালোপিয়ান নালিতে সমস্যা অথবা জরায়ু-সংক্রান্ত কিছু জটিলতাও গর্ভধারণের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি (Ectopic Pregnancy) বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ একটি গুরুতর শারীরিক অবস্থা। এটি সাধারণত জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে এবং ভবিষ্যতে সন্তানধারণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। সন্তানধারণে সমস্যা হলে শুধু মহিলার পরীক্ষা করানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী দু’জনেরই প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
আরও পড়ুন : Male Infertility treatment in Bengali | পুরুষের বন্ধ্যাত্ব নিয়ে ভ্রান্তি ভাঙতে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
আইভিএফের আগে কিছু দম্পতির ক্ষেত্রে আইইউআই বা ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (Intrauterine Insemination) পদ্ধতি বিবেচনা করা হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুর ভিতরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে ডিম্বাণুর কাছাকাছি পৌঁছনোর সুযোগ বাড়ে। এটি পরীক্ষাগারে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে নিষিক্ত করার পদ্ধতি নয়, নিষেক সাধারণত মহিলার শরীরের ভিতরেই ঘটে। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে আইইউআই উপযুক্ত হতে পারে। তবে ফ্যালোপিয়ান নালি বন্ধ থাকা, শুক্রাণুর গুরুতর সমস্যা কিংবা অন্য কিছু জটিলতার ক্ষেত্রে আইভিএফের মতো পদ্ধতি আগে বিবেচনা করা হতে পারে। কোন চিকিৎসা আগে করা হবে, তা নির্ভর করে বয়স, সমস্যার কারণ, কত দিন ধরে সন্তানধারণের চেষ্টা চলছে এবং পরীক্ষার ফলের উপর। সন্তানধারণের চেষ্টা দীর্ঘদিন সফল না হলে দম্পতিদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসার নানা ধাপ, আর্থিক ব্যয় ও বারবার প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অভিজ্ঞতা এই চাপ বাড়াতে পারে। আইভিএফের ক্ষেত্রেও প্রতিটি চক্রে সাফল্য নিশ্চিত নয়। তাই চিকিৎসা শুরুর আগে সম্ভাব্য সাফল্য, ঝুঁকি, ব্যয় এবং বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মানসিক সুস্থতার দিকেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। পরিবার বা কাছের মানুষের সহায়তা ও প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এই সময় কাজে আসতে পারে।
সন্তানধারণে সমস্যা হলেই আইভিএফ প্রথম পদক্ষেপ, এমন ধারণা ঠিক নয়। আবার যাঁদের ক্ষেত্রে অন্য পদ্ধতিতে সাফল্যের সম্ভাবনা কম, তাঁদের জন্য আইভিএফ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণমান, হরমোনের অবস্থা, জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান নালির স্বাস্থ্য এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার ফল বিচার করেই পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা দরকার। দ্রুত ফল পাওয়ার তাগিদে নিজে থেকে চিকিৎসা বেছে না নিয়ে, সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। কারণ প্রজনন চিকিৎসায় সবার জন্য একটিমাত্র পথ নেই; ব্যক্তির শারীরিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা করাই নিরাপদ ও যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Jwala Gutta breast milk donation | জ্বালা গুট্টা স্তন্যদুগ্ধ দান, অনন্য উদ্যোগ ভারতের ব্যাডমিন্টন তারকার



