প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজোর শেষ দিন মানেই দেবীবরণ, সিঁদুরখেলা আর উমাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা ও নাকে সোনার নথ বাঙালি বিবাহিতা নারীর সাবেকি সাজে এই অলঙ্কারের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। বিশেষত বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় দশমীর দেবীবরণে পরিবারের বধূদের সাজে নথের (Bengali Bridal Nath) ব্যবহার আজও চোখে পড়ে। কোথাও পুজোর আচার পালনের সময় নথ পরার রীতি আছে, কোথাও আবার সিঁদুরখেলার সাজে এই গয়না গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে। তবে নাকের অলঙ্কারের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক শুধু একটি গয়না পরার অভ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নথ, নথনি, নথুলি কিংবা নাকের অন্য অলঙ্কার স্থানীয় সংস্কৃতি, বিয়ের রীতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। নকশা, আকার, উপাদান ও পরার পদ্ধতিতে রয়েছে নানা বৈচিত্র্য।

বাংলার বহু পরিবারে নথকে বিবাহিতা নারীর সাজের পরিচিত অঙ্গ হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের দিন কনের সাজে যেমন নাকের গয়না গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই দুর্গাপুজোর দশমীতে দেবীবরণের সময়ও তার ব্যবহার দেখা যায়। প্রচলিত বাঙালি নথ সাধারণত সোনা বা রুপোর তৈরি হয়। এর আকার তুলনায় ছোট, নকশা সূক্ষ্ম এবং অলঙ্করণে থাকে পরিমিতি। কোনও নথের এক পাশে বা চারপাশে খোদাই করা নকশা থাকে, আবার কোনওটির সঙ্গে যুক্ত থাকে সরু ধাতব চেন। সেই চেন কখনও কানের কাছে, কখনও চুলের সঙ্গে আটকে রাখা হয়। অঞ্চল ও পরিবারের রীতি অনুযায়ী নথের নকশা বদলালেও সাবেকি বাঙালি সাজে এর নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। বাঙালির কাছে সিঁদুর যেমন বিবাহিত জীবনের সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত, তেমনই নথও বহু পরিবারের ঐতিহ্যবাহী সাজের অংশ। তবে সব বাঙালি পরিবারে নথ পরার নিয়ম এক নয়। কোথাও বিয়ের দিনেই মূলত এই অলঙ্কার পরা হয়, কোথাও আবার পুজোর বিশেষ আচারেও তার ব্যবহার রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সাজের ধরন বদলেছে, আধুনিক গয়নার বাজারেও এসেছে নানা নকশা। তবু বনেদি বাড়ির পুজোয় পুরনো রীতি মেনে নথ পরে দেবীবরণে অংশ নেওয়ার ছবি বাঙালির উৎসবের পরিচিত দৃশ্য হয়ে রয়েছে।

বাংলার বাইরে তাকালে নাকের গয়নার আরও বিচিত্র রূপ দেখা যায়। পাঞ্জাবের বিয়ের সাজে শিকারপুরী নথ (Shikarpuri Nath) তার আকার ও জাঁকজমকের জন্য পরিচিত। সাধারণত বড় বৃত্তাকার সোনার রিংয়ের মতো দেখতে এই অলঙ্কার কনের সাজে রাজকীয় মাত্রা যোগ করে। নথটির আকার বড় হওয়ায় সেটিকে স্থির রাখতে একটি সরু সোনার চেন ব্যবহার করা হয়। চেনটি গালের পাশ দিয়ে গিয়ে চুলে আটকে দেওয়া হয়, যাতে ভারী গয়নাটি সহজে নড়ে না যায়। ঐতিহ্যবাহী নকশায় রিংটি অনেক সময় তুলনায় সরল রাখা হলেও আধুনিক সংস্করণে মুক্তো, কুন্দন কিংবা অন্য অলঙ্করণও দেখা যায়। পাঞ্জাবি বিয়ের পোশাক ও গয়নার সঙ্গে এই বড় নথের সংযোগ কনের সাজকে আরও জমকালো করে তোলে। মহারাষ্ট্রের (Maharashtra) নথের নকশা আবার অন্য ধরনের। পেশোয়াই নথ (Peshwai Nath) অথবা ব্রাহ্মণী নথ (Brahmani Nath) নামে পরিচিত এই অলঙ্কার মরাঠি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গয়নাগুলির মধ্যে অন্যতম। সাধারণ গোল রিংয়ের বদলে এর গড়ন অনেক সময় ইংরেজি ‘৯’ সংখ্যার মতো বাঁকানো কিংবা কাজুবাদামের আকৃতির হয়। সোনার ফ্রেমের উপর ছোট মুক্তো, লাল রঙের রুবি ও সবুজ পান্নার ব্যবহার নথটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেয়। নকশার বিন্যাসে থাকে সূক্ষ্ম কারুকাজ, আর সামগ্রিক আকারে ধরা পড়ে মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী গয়নার নিজস্ব ঘরানা। কিছু নথ নাকের ছিদ্রে পরতে হয়, আবার কিছু নকশা ক্লিপের সাহায্যে নাকের পাশে আটকানো যায়। ফলে অলঙ্কারটির গড়ন ও পদ্ধতি অনুযায়ী বৈচিত্র্য দেখা যায়।
আরও পড়ুন : Basanta Utsav 2024 : বসন্তের রং বদল
উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) পাহাড়ি সংস্কৃতিতে তেহারি নথ (Tehri Nath) কিংবা নথুলি (Nathuli) বিশেষ পরিচিত। কুমায়ুনি ও গঢ়ওয়ালি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের সাজে এই নথের ব্যবহার রয়েছে। আকারে বড় ও অর্ধবৃত্তাকার এই অলঙ্কার অনেক সময় মুখের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে। সোনার উপর মীনাকারি, সূক্ষ্ম নকশা, মুক্তো এবং রঙিন পুঁতির ব্যবহার নথুলিকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। নকশায় স্থানীয় শিল্পরীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ছাপ থাকে। উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে বিয়ে এবং অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে কনের সাজে এই গয়নার গুরুত্ব রয়েছে। তবে নকশা, ওজন ও পরার রীতি সম্প্রদায়, পরিবার এবং স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী বদলাতে পারে। পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে বড় নথুলির সংযোগ বহুদিনের। আবার রাজস্থানের (Rajasthan) নথনি (Nathni) আবার রাজকীয় অলঙ্করণের জন্য পরিচিত। রাজপুত ও মারওয়াড়ি বিয়ের সাজে বড় সোনার নথের ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে। রিংয়ের এক পাশে কুন্দন অথবা পোল্কি পাথরের নকশা, ফুলের মোটিফ ও ঝলমলে অলঙ্করণ এই গয়নাকে জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলে। নথের আকার ও ওজন বেশি হলে সেটিকে সামলে রাখতে চেনের সাহায্য নেওয়া হয়। সেই চেন গালের পাশ দিয়ে গিয়ে কানের কাছে বা চুলে আটকানো থাকতে পারে। কোনও কোনও নকশায় ছোট মুক্তো কিংবা সোনার ঝুলও যুক্ত থাকে। রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, গয়না এবং বিয়ের সাজে নথনির উপস্থিতি স্থানীয় সংস্কৃতির এক পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুন : Durga Puja : আমেরিকায় দুর্গাপুজোয় /দুই

গুজরাতের (Gujarat) বোরি নথ (Bori Nath) -এর নকশাতেও বড় বৃত্তাকার গড়ন দেখা যায়। ঐতিহ্যবাহী গুজরাতি বিয়ের সাজে এই ধরনের নথের ব্যবহার রয়েছে। এর ভিতরের পরিধি বরাবর ছোট সাদা মুক্তো সারি দিয়ে বসানো থাকতে পারে। নকশা ও আকার অনুযায়ী নথটি ধরে রাখার জন্য চেন, ফিতে কিংবা অন্য সহায়ক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। সাজের সঙ্গে মানানসই করে গয়নার নকশায় পরিবর্তনও দেখা যায়। গুজরাতি পোশাকের উজ্জ্বল রং ও অলঙ্করণের সঙ্গে বড় নথের সমন্বয় কনের সাজে আলাদা মাত্রা যোগ করে। তবে গুজরাতের সব সম্প্রদায় বা অঞ্চলে একই ধরনের নথ প্রচলিত নয়, স্থানীয় রীতি ও পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী গয়নার ধরন বদলে যায়।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নাকের অলঙ্কারের এই বৈচিত্র্য দেখলে বোঝা যায়, একটি গয়না কী ভাবে আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। কোথাও বড় সোনার রিংয়ের সঙ্গে চেনের ব্যবহার, কোথাও মুক্তো ও রঙিন পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, আবার কোথাও ছোট ও পরিমিত নকশা, প্রতিটি ধরনই নিজস্ব নান্দনিকতা বহন করে। বিয়ের সাজে নথের উপস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই কিছু অঞ্চলে উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গেও এই অলঙ্কারের যোগ রয়েছে। তবে নথের ব্যবহারকে সর্বত্র একই অর্থে দেখা যায় না। এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নির্ভর করে স্থানীয় প্রথা, সম্প্রদায় ও পারিবারিক অভ্যাসের উপর। উল্লেখ্য, দুর্গাপুজোর দশমীতে বাঙালি বধূর নথ পরা তাই বৃহত্তর ভারতীয় গয়না-সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। একদিকে বাংলার বনেদি বাড়িতে দেবীবরণের সাবেকি সাজ, অন্যদিকে পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান ও গুজরাতের নিজস্ব নকশার নথ, সব ক্ষেত্রেই গয়নার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। আধুনিক ফ্যাশনের প্রভাবে নথের আকার ও উপাদানে বদল এলেও ঐতিহ্যবাহী নকশার চাহিদা এখনও রয়েছে। কারও পছন্দ ছোট সোনার নথ, কারও আবার বড় মুক্তো বসানো অলঙ্কার। পছন্দ আলাদা হলেও নাকের গয়না ভারতীয় নারীর সাজে যে দীর্ঘদিন ধরে জায়গা করে নিয়েছে, বিভিন্ন অঞ্চলের এই রীতিই তার পরিচয় বহন করে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Barisha Club Puja Theme 2026, Durga Puja Kolkata | পাথরের স্তম্ভে ধরা পড়বে সভ্যতার ইতিহাস, বড়িশা ক্লাবের দুর্গাপুজোয় এ বার ‘কালরেখা’



