মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেট মানেই ভারতীয় ব্যাটারদের সামনে কঠিন পরীক্ষা। সবুজ ঘাসে ঢাকা পিচ, ঠাণ্ডা আবহাওয়া, মেঘলা আকাশ ও বলের অপ্রত্যাশিত সুইং এই চার চ্যালেঞ্জ সামলাতে না পারলে বড় বিপদে পড়তে পারে যে কোনও ব্যাটিং বিভাগ। ছ’বছর আগে এই পরিস্থিতির মুখেই কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল ভারতকে। দুই টেস্টের সিরিজে নিউজিল্যান্ডের কাছে ০-২ ব্যবধানে হেরে ফিরেছিল বিরাট কোহলির দল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে আসন্ন টেস্ট সিরিজের আগে ভারতীয় ব্যাটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল গাওস্কর (Sunil Gavaskar)। তাঁর মতে, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বড় শট কিংবা অতিরিক্ত আগ্রাসন নয়। তাঁর মত ধৈর্য, সঠিক ব্যাটিং কৌশল এবং বলকে যতটা সম্ভব দেরিতে খেলার অভ্যাস।
আরও পড়ুন : Durga Puja 2026, Shubho Bijoya | শুভ বিজয়া ২০২৬: বঙ্গে বিষাদের সুর, আবার অপেক্ষা আগামী বছরের
শুভমন গিলের (Shubman Gill) নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলকে নিউজিল্যান্ডের পরিবেশে ব্যাটিংয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে প্রথমেই বদলাতে হবে শট খেলার ধরন। ইংল্যান্ডের মতো নিউজিল্যান্ডেও বলের গতিপ্রকৃতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গাওস্করের পরামর্শ, বল ব্যাটারের কাছে আসার আগে তাড়াহুড়ো করে শট খেলতে গেলে বিপদ বাড়তে পারে। তা বলকে শরীরের কাছাকাছি আসতে দিয়ে তার পর ব্যাট চালানো উচিত। এতে পিচ থেকে বলের দিক পরিবর্তন সামলানোর সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে প্রথম দিকে উইকেটে থিতু হওয়ার সময় ব্যাটারদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নিউজিল্যান্ডের পরিবেশে ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে কঠিন দিক হল বলের সুইং। বল বাতাসে থাকাকালীন এক দিকে বাঁক নিতে পারে, আবার পিচে পড়ার পরও তার গতিপথ বদলে যেতে পারে। বাতাসে বলের নড়াচড়া কিছুটা আগে থেকে আন্দাজ করা সম্ভব হলেও পিচে পড়ে সুইং করলে ব্যাটারের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক কম থাকে। এই কারণেই গাওস্কর ব্যাটারদের বল দেরিতে খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যাটার যদি আগে থেকেই শট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তা হলে বলের শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ বলকে যত দেরিতে খেলা যায়, ততই তার গতিপথ বুঝে ব্যাট চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
শুধু শট খেলার সময় নয়, ব্যাট চালানোর ধরনেও পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন ভারতের প্রাক্তন এই ওপেনার। তাঁর মতে, ব্যাট জোরে ঘোরানোর প্রবণতা কমিয়ে হালকা হাতে বলের মোকাবিলা করা উচিত। নিউজিল্যান্ডের পিচে প্রতিটি বলকে বাউন্ডারিতে পাঠানোর চেষ্টা করতে গেলে উইকেট হারানোর আশঙ্কা বেড়ে যায়। বরং প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত বলের লাইন ও লেংথ বিচার করে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলা। ব্যাটার একবার উইকেটে সময় কাটিয়ে দিলে, পিচ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে রান করার সুযোগও বাড়বে। এই পরামর্শের পিছনে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ভারতের সাম্প্রতিক অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা। ২০২০ সালে শেষ বার নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজ খেলেছিল ভারতীয় দল। সেই সফরে দুই টেস্টের সিরিজে ভারতকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিল স্বাগতিকেরা। চার ইনিংসে ভারতের সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ১৬৫, ১৯১, ২৪২ এবং ১২৪ রান। প্রতিটি ইনিংসেই ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। প্রতিপক্ষের পেস আক্রমণ এবং অনুকূল পরিবেশের সামনে ভারতীয় ব্যাটারদের লড়াই বারবার থমকে গিয়েছিল। সেই সিরিজের ফলাফল এখনও নিউজিল্যান্ডে ভারতের টেস্ট পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসে।
আরও পড়ুন : Sunil Gavaskar | অস্ট্রেলিয়ায় ‘কাগুজে বাঘ’! সুনীল গাভাসকর কড়া আক্রমণে ইংল্যান্ডের বাজবল
এবার অবশ্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ভারতীয় দলের হাতে রয়েছে বাড়তি সময়। সাধারণত বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজের আগে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের ব্যবধান, ঘুমের রুটিন, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও অনুশীলনের পরিবেশ এসব কিছুর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে হয় ক্রিকেটারদের। গাওস্করের মতে, এবার ভারতীয় দল আগেভাগে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছনোয় কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। কারণ, সফরের শুরুতেই টি-টোয়েন্টি ও এক দিনের সিরিজ খেলার পরিকল্পনা থাকায় ক্রিকেটারেরা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। তার পর টেস্ট সিরিজ শুরু হলে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আলাদা করে লড়তে হবে না তাঁদের।
কিন্তু, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সাফল্য পেলেই যে টেস্টে একই রকম ফল পাওয়া যাবে, এমনটা মনে করছেন না গাওস্কর। দুই ধরনের ক্রিকেটের মধ্যে পার্থক্য অনেক। টি-টোয়েন্টি কিংবা এক দিনের ম্যাচে দ্রুত রান তোলার জন্য ব্যাটাররা আগ্রাসী শট খেলতে পারেন। কিন্তু পাঁচ দিনের ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানোই আসল পরীক্ষা। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সেই পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, পেসাররা অনুকূল পরিবেশ পেলে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটারদের উপর চাপ বজায় রাখতে পারেন। আবহাওয়ার দিকটিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডে এই সময় ঠাণ্ডা, মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা পিচের চরিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। ঘাসে ঢাকা উইকেটে বলের সুইং বেড়ে গেলে ব্যাটারদের জন্য রান তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম কয়েক ওভারেই উইকেট হারালে দলের উপর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে। তাই শুরু থেকেই উইকেট বাঁচিয়ে খেলার মানসিকতা রাখতে হবে ভারতীয় ব্যাটারদের। গাওস্করের মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হল উইকেটে টিকে থাকা। এক বার ব্যাটার সেট হয়ে গেলে এবং বলের নড়াচড়া বুঝতে শুরু করলে রান করার পথ তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
ভারতের ব্যাটিং বিভাগের দিকে তাকালে শুভমন গিলের পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নিউজিল্যান্ডের মতো পরিস্থিতিতে শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কোন বল ছেড়ে দেওয়া উচিত, কোন বল রক্ষণাত্মকভাবে খেলা দরকার ও কোন সুযোগে রান নেওয়া সম্ভব, এই সিদ্ধান্তগুলিই ইনিংসের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। ব্যাটাররা যদি প্রতিটি বলেই রান করার তাগিদে থাকেন, তা হলে প্রতিপক্ষের বোলারদের উইকেট নেওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে প্রথম টেস্টে ভারত কেমন শুরু করে, তার উপর সিরিজের পরবর্তী লড়াই অনেকটাই নির্ভর করতে পারে। বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে বড় রান তুলতে পারলে বোলারদের জন্যও ম্যাচে লড়াই করার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে অল্প রানে অলআউট হয়ে গেলে প্রতিপক্ষের উপর চাপ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই গাওস্করের পরামর্শ শুধু ব্যাটিংয়ের কৌশল নয়, বরং গোটা দলের ম্যাচ পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। ব্যাটারদের ধৈর্য ধরে খেলতে হবে, আবার সুযোগ এলে রান তুলতেও পিছিয়ে থাকলে চলবে না। প্রকাশিত সূচী অনুযায়ী, ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা ভারত-নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ। ওয়েলিংটনের বেসিন রিজ়ার্ভে হবে প্রথম টেস্ট। দ্বিতীয় ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা ২৭ নভেম্বর থেকে, ক্রাইস্টচার্চে। দুই ম্যাচের এই সিরিজে ভারতের লক্ষ্য শুধু আগের হারের বদলা নেওয়া নয়, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (World Test Championship) ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাও। পয়েন্টের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজে প্রতিটি জয় মূল্যবান হতে পারে। ফলে শুরু থেকেই ভুলের সুযোগ কম থাকবে।
গাওস্করের বক্তব্যে তাই বারবার ফিরে এসেছে একটি বিষয়, নিউজিল্যান্ডে ব্যাটিং করতে হলে আগে পরিস্থিতিকে সম্মান করতে হবে। পিচে ঘাস রয়েছে বলে ভয় পেয়ে গেলে চলবে না, আবার আগ্রাসী ক্রিকেটের নামে অযথা ঝুঁকি নেওয়াও ঠিক হবে না। বলের গতিপ্রকৃতি বুঝে, শরীরের কাছে আসতে দিয়ে, নরম হাতে ব্যাট চালিয়ে এবং রক্ষণাত্মক কৌশলকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। ব্যাটাররা যদি প্রথম বাধা অতিক্রম করতে পারেন, তা হলে বড় ইনিংস গড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। ছ’বছর আগের ০-২ ব্যবধানে সিরিজ হার ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে একটি সতর্কবার্তা হয়ে রয়েছে। এ বার সেই স্মৃতি বদলানোর সুযোগ রয়েছে গিলদের সামনে। তবে তার জন্য শুধু নামী ক্রিকেটার কিংবা শক্তিশালী দল থাকলেই চলবে না, মাঠে প্রয়োগ করতে হবে সঠিক পরিকল্পনা। গাওস্করের টোটকা মেনে ভারতীয় ব্যাটাররা কতটা ধৈর্য দেখাতে পারেন, নিউজিল্যান্ডের সুইং সামলাতে কতটা সফল হন এবং কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের উইকেট রক্ষা করতে পারেন কি না, তার উপরই নির্ভর করবে সিরিজের ভবিষ্যৎ। সবুজ পিচে আগ্রাসনের চেয়ে সংযমই যে বড় অস্ত্র, সেই কথাই আরও এক বার মনে করিয়ে দিলেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma Captaincy | রোহিত শর্মাকে সরিয়ে শুভমন গিলকে অধিনায়ক, নির্বাচক আগরকর ইঙ্গিত দিলেন কোচ গম্ভীরের পরামর্শ



